উল্লাপাড়ায় নিয়ম না মেনে সেচে ফসলের ভাগে বোরো ধান আবাদ

0
উল্লাপাড়ায় নিয়ম না মেনে সেচে ফসলের ভাগে বোরো ধান আবাদ

সাহারুল হক সাচ্চুঃ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সেচ নির্ভর বোরো ধান আবাদ শুরু হয়েছে। প্রায় সব মাঠেই এর আবাদে সেচ মেশিনে (গভীর নলকূপ ও অগভীর নলকূপ ) জমিতে পানি সেচ দেওয়া হচ্ছে। বোরো ধান আবাদে ডিজেল ও বিদ্যুত চালিত অগভীর সেচ মেশিন মালিকেরা জমিতে পানি সেচ বাবদ ফসলের ভাগ ( অংশ ) নেওয়ার চুক্তি করে সেচ দিচ্ছেন। সেচ মেশিন মালিকেরা ধানের সিকি ভাগ কিংবা পাচ ভাগের এক ভাগ নেবেন বলে কৃষকদের সাথে মুখে চুক্তি করে নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে সরকারের নিয়ম রয়েছে বোরো ধান ফসলের আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ নলকূপ মালিককে ফসলের কোনো ভাগ নয় নগদ টাকা নিতে হবে। উপজেলা সেচ কমিটি থেকে বোরো ধান আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অগভীর ও গভীর নলকূপে বোরো ধান আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ বিঘা প্রতি হারে দর বেধে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুত ও ডিজেল চালিত সেচ মেশিনে আলাদা সেচ চার্জ ধরা হয়েছে। এদিকে সেচ বাবদ ফসলের ভাগ নেওয়া হবে বলে অভিযোগ পেয়ে বিএডিসি থেকে সেচ বাবদ টাকা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জানা গেছে এবারের মৌসুমে গোটা উপজেলায় মোট ৩০ হাজার ৩৭০ হেক্টর পরিমাণ জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত মঙ্গলবার ০৩ ফেব্রুয়ারি অবধি ১১ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে চারা লাগানো হয়েছে। দিন যেতেই বোরো ধান আবাদে মাঠের কাজে কৃষকদের ব্যস্ততা বাড়ছে। উপজেলার সলঙ্গা , রামকৃষ্ণপুর, হাটিকুমরুল, পূর্ণিমাগাতী, বড়হর , সদর উল্লাপাড়া ইউনিয়ন এলাকায় বোরো ধানের আবাদ আগে শুরু করা হয়েছে। কৃষকরা বেশি হারে ফলন মেলে এমন সব জাতের চারা জমিতে লাগাচ্ছেন।

বিএডিসি উল্লাপাড়া অফিস সূত্র জানায়, গোটা উপজেলায় বরেন্দ্র প্রকল্পের ও ব্যক্তিগত মিলে প্রায় পোনে তিনশ গভীর নলকূপ চালু রয়েছে। এর মধ্যে বিএডিসির আওতায় ১৭৫ টি গভীর নলকূপ ও ৩৮ টি এলএলপি সেচ মেশিন চলছে। বিএডিসির সবগুলো গভীর নলকূপই বিদ্যুতচালিত বলে জানা গেছে । উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জানা তথ্যে গোটা উপজেলায় বিদ্যুত ও ডিজেল চালিত মিলে ১০ হাজার ৬৩৯ টি অগভীর নলকূপ চালু আছে। বিদ্যুত চালিত অগভীর নলকূপ হলো ৩ হাজার ৮৯৪ টি ও ৬ হাজার ৫৯৫ টি অগভীর নলকূপ ডিজেল চালিত বলে জানানো হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি সৌর বিদ্যুত চালিত সেচ মেশিন চালু আছে বলে জানা গেছে ।

বিএডিসি অফিস থেকে আরো জানা গেছে এবারের বোরো ধান আবাদে বিদ্যুত চালিত গভীর নলকূপে জমিতে পানি সেচ বাবদ ( সম্ভাব্য স্কীম ২০০ বিঘা ) বিঘা প্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকা, ডিজেল চালিত গভীর নলকূপে ( সম্ভাব্য স্কীম ২০০ বিঘা ) বিঘা প্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা, বিদ্যুত চালিত গভীর নলকূপে ( সম্ভাব্য স্কীম ১৫০ বিঘা ) বিঘা প্রতি ২ হাজার ১০০ টাকা , বিদ্যুত চালিত অগভীর নলকূপে ( সম্ভাব্য স্কীম ২৫ বিঘা ) বিঘা প্রতি ২ হাজার ২০০ টাকা এবং ডিজেল চালিত অগভীর নলকূপে (সম্ভাব্য স্কীম ২৫ বিঘা ) বিঘা প্রতি ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চর এলাকার জন্য বিদ্যুত চালিত অগভীর নলকূপে ( সম্ভাব্য স্কীম ২৫ বিঘা ) ও ডিজেল চালিত অগভীর নলকূপে (সম্ভাব্য স্কীম ১৫ বিঘা ) ৪ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা সেচ কমিটি থেকে এ সেচ চার্জ বেধে দেওয়া হয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন মাঠে এখন বছরের প্রধান বোরো ধান ফসলের আবাদ শুরু হয়েছে। কৃষকেরা জমিতে বোরো চারা লাগাচ্ছেন। এর আবাদে আগে জমি তৈরিতে সেচ মেশিনে পানি সেচ দেওয়া হচ্ছে। এর কদিন পর থেকেই চারা লাগানোর পর জমিতে সেচ মেশিনে পানি সেচ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন অগভীর নলকূপ ( বিদ্যুত চালিত ও ডিজেল চালিত শ্যালো মেশিন ) মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা বোরো ধান ফসলের আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ টাকা নিতে আগ্রহী নন। তারা জমির ফসলের ভাগ (অংশ) নেওয়ার চুক্তিতে পানি সেচ দেন। এখন তা দিচ্ছেন। উল্লাপাড়া সদর ইউনিয়নের বাখুয়া, নাগরৌহা, বড়হর ইউনিয়নের কুমারগাতি , পাগলা বোয়ালিয়া, হাটিকুমরুল ইউনিয়নের পাটধারী , সলঙ্গা ইউনিয়নের গোজা , জগজীবনপুর মাঠের অনেক কটি অগভীর নলকূপ মালিক বলেন জমির ফসলের পাচ ভাগের এক ভাগ (অংশ) নেওয়ার চুক্তিতে তারা জমিতে পানি সেচ দিচ্ছেন। আবার চার ভাগের একভাগ চুক্তিতে দুএকজন সেচ মেশিন মালিক পানি সেচ দিচ্ছেন।

বড়হর ইউনিয়নের কুমারগাতি মাঠে ডিজেল ও বিদ্যুত চালিত গোটা ছয়েক অগভীর সেচ মেশিন ফসলের ভাগ চুক্তিতে বোরো আবাদে জমিতে পানি দিচ্ছেন। কৃষক ও সেচ মেশিন মালিকেরা ফসলের ভাগ নেওয়া দেওয়ায় মুখে চুক্তি করে নিয়েছেন। কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন নিজের ডিজেল চালিত অগভীর সেচ মেশিন প্রায় বারো বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদে পানি সেচ বাবদ ফসলের পাচ ভাগের এক ভাগ নেবেন বলে চুক্তিতে পানি সেচ দিচ্ছেন। উল্লাপাড়া সদর নাগরৌহা গ্রামের উত্তরপাড়া মাঠে এ বিদ্যুত চালিত ও ডিজেল চালিত গোটা বিশেক অগভীর সেচ মেশিন আছে। এর কয়েকটি সেচ মেশিন জমিতে পানি দেওয়ায় চালু করা হয়েছে।সেচ মেশিন মালিকেরা জানান জমির ধান ফসলের সিকি ভাগ নয়তো পাচ ভাগের একভাগ নেওয়ার চুক্তিতে জমিতে পানি সেচ দিচ্ছেন। কোনো কাগজে নয়, মুখের চুক্তিতে জমিতে পানি সেচ দেওয়া হয়ে থাকে। সেচ মেশিন মালিক কৃষক মো. নুরুজ্জামান সোহরাব বলেন বোরো ধানের আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ ধান ফসলের পাচ ভাগের একভাগ নেওয়ার চুক্তিতে গত কয়েক বছরের মতো এবারেও জমিতে পানি সেচ দিচ্ছেন। এলাকার অন্য সেচ মেশিন মালিকেরা সেচ বাবদ টাকা নিলে তিনিও জমিতে পানি সেচ বাবদ টাকা নেবেন বলে জানান। আরেক কৃষক বলেন অনেক আগে থেকেই বোরো ধান ফসলের আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ ফসলের ভাগ নেওয়া চলে আসছে।

সরকারের নিয়ম রয়েছে বোরো ধান ফসলের আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ জমির ফসলের ভাগ নেওয়া যাবে না। সেচ বাবদ টাকা নিতে হবে। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ও কৃষকদের অনেকেরই সাথে কথা বলে জানা গেছে উপজেলা সেচ কমিটির সিদ্ধান্তের বিষয়টির ( সেচ বাবদ টাকা নেওয়া ) প্রচার এলাকায় এখনো জোরালো প্রচার প্রচারণা নেই।

সরকারের বিএডিসি (পানাসি সেচ উন্নয়ন প্রকল্প) উল্লাপাড়া জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. আসাফুজ্জান বলেন উপজেলা সেচ কমিটি জমিতে পানি সেচ বাবদ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বোরো ধান , রোপা আমন ধানসহ সব ধরনের ফসল আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ ফসলের ভাগ (অংশ) নেওয়া যাবে না। জমিতে পানি সেচ বাবদ টাকা নিতে হবে। এর জন্য বিএডিসি সেচ বিভাগ থেকে বিঘা প্রতি দর টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। কোনো সেচ মেশিন মালিক কিংবা পরিচালকেরা টাকা না নিয়ে নিয়ম অমান্য করে ফসলের ভাগ নেওয়ার অভিযোগ পেলে তার বিভাগ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। এরই মধ্যে দুটি গভীর ও দুটি অগভীর নলকূপ মালিক পরিচালনাকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বোরো ধান ফসলের আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ টাকা নেওয়ার বিষয় ও নির্ধারণ করা টাকার তালিকা ইউনিয়ন পরিষদগুলোয় টানানো হবে। এছাড়া শিগগরিই গোটা উপজেলায় ব্যাপকভাবে প্রচার চালানো হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সূবর্ণা ইয়াসমিন সূমী বলেন বোরো ধান আবাদে জমিতে পানি সেচ বাবদ কৃষকদের কাছ থেকে টাকা না নিয়ে ফসলের ভাগ নেওয়া হলে আবাদকারি কৃষকদের ক্ষতি বলতে লোকসান হয়ে থাকে। সরকারের নিয়ম অমান্য করা হয়ে থাকে। বোরো ধান ফসলের জমিতে সেচ বাবদ টাকা না নিয়ে ফসলের ভাগ নেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় জানানো হবে।