মুহ. মিজানুর রহমান বাদল : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে নির্বাচনীয় প্রচারণা শেষ। এ আসনে নির্বাচনের ফলাফল শেষ হাসিটা হাসবেন ধানের শীষ প্রার্থী ইঞ্জি. মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। মানিকগঞ্জ-২ আসনে ভোটের মাঠে শুরু থেকেই তুলনামূলক সীমিত আলোচনা চললেও সাধারণ ভোটাররা প্রকাশ্যে ভোটের বিষয়ে মুখ খুলতে অনাগ্রহী। তবে শেষ পর্যায়ে প্রার্থীদের গণসংযোগে ধীরে ধীরে উত্তাপ বেড়েছে। বিএনপির ঘাঁটি সিংগাইর-হরিরামপুর এক সময় ছিল। হারানো সেই আসন এবার পুনরুদ্ধার করতে ধানেরশীষ নিয়ে ক্লিনইমেজের শান্ত উঠে পড়ে লেগেছেন।তবে এ আসনে ১১ জোটের প্রার্থী দেয়ালঘড়ি নিয়ে মাঠে আছেন খেলাফত মজলিশে মুহাদ্দিস সালাহউদ্দিন। অপরদিকে পিছিয়ে থেকেও জয়লাভের আশাবাদী লাঙল নিয়ে আছেন এসএম আবদুল মান্নান।
মানিকগঞ্জ-২ আসন গঠিত হয়েছে সিংগাইর, হরিরামপুর এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এই আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস বর্ণাঢ্য। আশির দশকে সিংগাইর ও মানিকগঞ্জ সদর নিয়ে গঠিত ছিল মানিকগঞ্জ-৪ আসন ছিল। সে সময় ৩য় ও ৪র্থ (১৯৮৬ ও ১৯৮৮) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম সারওয়ার মিলন টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় তিনি শিক্ষা উপমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। নব্বই দশকে গণতন্ত্রোত্তর সময়ে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আসনটিতে টানা চারবার জয়লাভ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুল ইসলাম খান নয়ামিয়া। তিনি শিল্পমন্ত্রী হন। ২০০৬ সালে তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করলে উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রয়াত শামসুল ইসলাম খান নয়ামিয়ার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। ওই সময় আওয়ামী লীগের টানা আন্দোলন সংগ্রামের ফলে দেশে সেনা শাসন অধিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জের চারটি আসনকে পুনবিন্যাস করে তিনটি আসন করা হয়। এতে নতুন আঙ্গিকে সিংগাইর- হরিরামপুর ও সদরের একাংশ নিয়ে গঠিত হয় মানিকগঞ্জ-২ আসন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হারুণার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আফরোজা খান রিতাকে পরাজিত করে এ আসনে পুনরায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম আব্দুল মান্নান সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে ১৮ বছর পরে পুনরায় জাতীয় পার্টি আসনটি পুনরুদ্ধার করে।
২০১৪-২০১৮ সালে পর্যন্ত আসনটিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম। পরে ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ একক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমকে পরাজিত করে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন নিজ দলীয় জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলু।
এবারের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন বিএনপি মনোনীত ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত, জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আব্দুল মান্নান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আলী এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুহাদ্দিস শেখ মুহাম্মাদ সালাহ উদ্দিন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা ও দৃশ্যমান প্রচারণায় ধানের শীষ এগিয়ে রয়েছেন। বিএনপির ভেতরের দীর্ঘদিনের কোন্দল অনেকটাই নিরসন হওয়ায় ধানের শীষের প্রচারণায় নতুন গতি এসেছে। থানা বিএনপির সভাপতি আবিদুর রহমান খান রোমান মনোনয়ন প্রত্যাহার করে ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মাহাবুবুর রহমান মিঠু ও পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট খোরসেদ আলম ভূঁইয়াসহ স্থানীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট চাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ভোটের চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে ভোটারদের কিছু অংশ দেয়াল ঘড়ি প্রতীকের দিকে ঝুঁকতে পারে। জামায়াতে ইসলামী সরাসরি প্রার্থী না দেওয়ায় ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে খেলাফত মজলিসের শেখ সালাহ উদ্দিন এই আসনে একেবারে নতুন। তবে তিনি ভোটারের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দলটির কিছু ভোট জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে স্থানান্তরিত হতে পারে। ফলে এস এম আব্দুল মান্নান মাঠপর্যায়ে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকলেও শেষ মুহূর্তের ভোট স্থানান্তর ফলাফলে আশাবাদী রয়েছে তিনি।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট নিয়ে উত্তাপ কম। অনেকেই বলছেন, পরিবেশ অনুকূলে থাকলে ভোট দিতে যাবেন, অন্যথায় উপস্থিতি কম হতে পারে।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭২ হাজার ৬২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৭ হাজার ২১২, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৬ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন।
সব মিলিয়ে প্রচারণায় ধানের শীষ এগিয়ে থাকবে। ১১ জোটের নীরব ভোট, জোট সমীকরণ এবং ভোটের শেষ মুহূর্তের স্থানান্তর মিলিয়ে মানিকগঞ্জ-২ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও অনিশ্চিত নিয়ে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে গণ জোয়ারে পিতার আসনে ধানেরশীষ প্রতীক বিপুল ভোটে জয়লাভ করেবে বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের ধারনা।

