আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, বর্তমানে তার ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। একের পর এক যুদ্ধ, গাজা ও লেবানন সীমান্ত পেরিয়ে সংঘাতের বিস্তার এবং বিশেষ করে ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তীব্র অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন ইসরাইলি নাগরিকরা। আতঙ্ক এতটাই প্রকট যে, দলে দলে দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন দেশটির সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ পেশাজীবীরা।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল ও মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হামলার ভয়ে অনেক ইসরাইলি ইউরোপ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। বিশেষ করে মিসর সীমান্তবর্তী ছোট শহর তাবা এখন ইসরাইলিদের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পর থেকে দেশ ছাড়ার এই হিড়িক আরও বেড়েছে। বিমানবন্দর কর্মীদের তথ্যমতে, বর্তমানে তাবা থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিটি ফ্লাইটই যাত্রীতে পূর্ণ থাকছে। সিনাই ক্রসিং পার হতে আগের চেয়ে দ্বিগুণ ফি গুনতে হলেও জীবন বাঁচাতে মরিয়া ইসরাইলিরা সেটি মেনে নিচ্ছেন।
দেশের ভেতরেও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলছে ছোটাছুটি। দক্ষিণের শান্ত মরুভূমির শহর মিৎসপে রামনে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। ৬ হাজার বাসিন্দার এই শহরে যুদ্ধের ডামাডোল ও সাইরেনের শব্দ তুলনামূলক কম হওয়ায় এটিকে ‘নিরাপদ স্বর্গ’ মনে করছেন অনেক ইসরাইলি। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, কয়েক দিনেই সেখানে ৩ হাজারের বেশি নতুন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়ংকর তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রায় এক লাখ মানুষ ইসরাইল ত্যাগ করেছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ৫০ হাজার মানুষ দেশ ছেড়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো গত দুই বছরে প্রায় ৯৫০ জন অভিজ্ঞ চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন। এদের বড় অংশই ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। পিএইচডিধারী গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্যে দেশান্তরী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং উচ্চআয়ের প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবীরাও ইসরাইলে থাকার ভরসা পাচ্ছেন না।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যেভাবে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ ও চিকিৎসকরা দেশ ছাড়ছেন, তাতে দীর্ঘ মেয়াদে ইসরাইলের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে। যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়া এবং প্রতিনিয়ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্ক দেশটির মানবসম্পদকে শূন্য করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজা থেকে শুরু হওয়া অশান্তি এখন মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে খোদ ইসরাইলের অস্তিত্বের ওপর মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। যে নাগরিকরা এক সময় ইসরাইলকে নিরাপদ ভেবেছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সেই বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

