পায়ে শিকল বাঁধা সেই নারী ফিরলেন স্বজনদের কাছে

0
পায়ে শিকল বাঁধা সেই নারী ফিরলেন স্বজনদের কাছে

বাগেরহাট প্রতিনিধি: সময় টেলিভিশনে সংবাদ প্রচারের পর অবশেষে স্বজনদের কাছে ফিরে গেছেন পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া নাম-পরিচয়হীন সেই নারী। শনিবার মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিজেদের মেয়ে ও বোন হিসেবে শনাক্ত করেন। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে ফিরে পেয়ে হাসপাতালজুড়ে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।

উদ্ধার হওয়া ওই নারীর নাম রাবেয়া আক্তার। তিনি রুহুল আমিন ও সায়েরা বেগম দম্পতির মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ছোটবেলায় বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার পর চরম অভাব-অনটনের মধ্যে মা ও তিন বোনের সঙ্গে বড় হন রাবেয়া। পরবর্তীতে তার বিয়ে হলেও স্বামীর অবহেলা, দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকটের কারণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

রাবেয়ার ঘরে রয়েছে মাত্র ছয় মাস বয়সী একটি পুত্রসন্তান। মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। গত ১৮ জুন সকালে হঠাৎ করেই বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন রাবেয়া। এরপর দীর্ঘ এক মাস বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। মেয়েকে হারিয়ে মা সায়েরা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন।

গত ৫ জুলাই সকালে মোংলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পায়ে শিকল বাঁধা ও রক্তাক্ত জখম অবস্থায় রাবেয়াকে দেখতে পান স্থানীয় যুবক রাজু। মানবিক বিবেচনায় তিনি তাকে উদ্ধার করে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরিচয়হীন হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে।

মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এস এম শাহরিয়ার ইসলাম জানান, হাসপাতালে ভর্তির সময় রাবেয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও রক্তাক্ত ক্ষত ছিল। পায়ে লোহার শিকল বাঁধা থাকার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। টানা ১৪ দিন নিবিড় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, “প্রথম দিকে তিনি নিজের নাম ও বাবা-মায়ের নাম আংশিক বলতে পারলেও পরে মানসিক ট্রমার কারণে আর কিছুই মনে করতে পারছিলেন না। ফলে তার পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।”

সম্প্রতি সময় টেলিভিশনে রাবেয়াকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রচারিত হলে বিষয়টি তার পরিবারের নজরে আসে। টেলিভিশনে ছবি দেখে শনিবার সকালে মোংলা হাসপাতালে ছুটে আসেন বড় বোন সুপিয়া বেগমসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। দীর্ঘদিন পর বোনকে জীবিত ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও যাচাই-বাছাই শেষে রাবেয়াকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এ সময় স্বজনরা সময় টেলিভিশন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমীন আক্তার সুমী বলেন, “অজ্ঞাত পরিচয়ের নারীকে উদ্ধারের পর থেকেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে তার পরিবারকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানকে কোলে নিয়ে সংসারের নানা সংকট ও স্বামীর অবহেলায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন রাবেয়া। একপর্যায়ে তিনি বাসে উঠে অজানা গন্তব্যে রওনা দেন। পথে কোনো একসময় বাস থেকে পড়ে বা ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখনও তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে সেই আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

অবশেষে এক মাসেরও বেশি সময় পর স্বজনদের কাছে ফিরে আসায় রাবেয়ার পরিবারে স্বস্তি ফিরেছে। এখন তাদের একমাত্র চাওয়া—রাবেয়া যেন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে তার ছয় মাসের সন্তানকে নিয়ে নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।