চট্টগ্রাম প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য চিরতরে নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে পতেঙ্গায় র্যাব-৭ এর সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “জঙ্গল সলিমপুরের অবৈধ কর্মকাণ্ডের আস্তানা আমরা ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেব। সন্ত্রাসীরা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়।”
নিহত র্যাব সদস্য মোতালেবের জানাজা শেষে র্যাব ডিজি জানান, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে এবার সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন এবং জেলা পুলিশ সমন্বয়ে একটি বিশাল যৌথ বাহিনী গঠন করা হচ্ছে। সরকারি জায়গা দখল করে যারা সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, তাদের উচ্ছেদ করতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এরই মধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে। শীঘ্রই এই ‘অপারেশন সলিমপুর’ শুরু হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
গত অভিযানে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার সময় কেন পাল্টা গুলি চালানো হলো না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডিজি বলেন, “বেসরকারি আত্মরক্ষার অধিকার (Right of Private Defence) আমাদের ছিল। কিন্তু সেখানে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। সাধারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই আমাদের সদস্যরা সংযম প্রদর্শন করেছেন।” তবে অভিযানের কৌশলগত কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত পর্ষদ গঠন করা হয়েছে।
র্যাব সদস্য মোতালেব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন র্যাব প্রধান। তিনি জানান: একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। হামলায় সরাসরি জড়িতদের নাম পাওয়া গেছে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা খুব শীঘ্রই প্রকৃত দোষীদের জনসমক্ষে আনবেন।
কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারানো র্যাব সদস্য মোতালেবের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, “আমরা তার শূন্যতা পূরণ করতে পারব না, তবে মোতালেবের পরিবারের সকল দায়িত্ব র্যাব গ্রহণ করল। তারা যেন কোনো কষ্টে না থাকে, তা আমরা নিশ্চিত করব।”
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, “জনগণ ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা নিয়ে আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছি। কোনো অপশক্তিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না।”
কেন দুর্ভেদ্য জঙ্গল সলিমপুর: সন্ত্রাসীদের ‘সেফ হেভেন’ হওয়ার ৩ কারণ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং এলাকা। কেন এই এলাকাটি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে, তার মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
ভৌগোলিক অবস্থান ও দুর্গম পাহাড়: জঙ্গল সলিমপুর মূলত পাহাড়বেষ্টিত একটি বিশাল এলাকা। এর একদিকে সীতাকুণ্ডের গহিন পাহাড়, অন্যদিকে বায়েজিদ ও হাটহাজারী সংযোগ। এই পাহাড়ি খাঁজ ও দুর্গম পথ অপরাধীদের জন্য নিখুঁত আত্মগোপন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। আধুনিক ড্রোন বা প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং গহিন জঙ্গলের সুবিধা নিয়ে সন্ত্রাসীরা এখানে নিজেদের ‘প্যারালাল স্টেট’ বা সমান্তরাল রাজ্য গড়ে তুলেছে।
সরকারি খাস জমি ও অবৈধ দখলদারিত্ব: প্রায় ৩ হাজার একরের এই পাহাড়ের বিশাল অংশ সরকারি খাস জমি। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ভূমিদস্যুরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভূমিহীন ও ভাসমান মানুষদের এখানে এনে বসতি স্থাপন করিয়েছে। এই বিশাল ‘ভোট ব্যাংক’ ও জনবসতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা নিজেদের আড়াল করে রাখে।
অবৈধ পরিষেবার সিন্ডিকেট: এখানে সরকারি কোনো বৈধ গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ নেই। তবে শক্তিশালী সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটগুলো পাহাড় কেটে অবৈধভাবে এসব সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই বিশাল আর্থিক লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ রাখতে তারা নিজস্ব ‘ক্যাডার বাহিনী’ ও অবৈধ অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলেছে, যা র্যাব বা পুলিশের সাধারণ অভিযানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

