বাংলাদেশ প্রতিবেদক: দীর্ঘ ১৮ বছরের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা আর রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গত তিনটি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের পর এবারই প্রথম পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন দেশের কোটি কোটি ভোটার। সারা দেশ এখন উৎসবমুখর; চায়ের কাপে বইছে তুফান, আর গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘ভোট’।
এক নজরে নির্বাচনী প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে আজ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়েছে।
ভোটগ্রহণ শুরু: সকাল ৭:৩০ মিনিট।
ভোটগ্রহণ শেষ: বিকেল ৪:৩০ মিনিট (বিরতিহীন)।
মোট ভোটার: ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন।
ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ: ৪২,৭৭৯টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি কক্ষে ভোট নেওয়া হবে।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন এবার নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইসি জানিয়েছে, প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত নজরদারি: প্রথমবারের মতো এবার ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণে ড্রোন এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী: মাঠে রয়েছেন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আনসারসহ মোট ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৩.৫৬ শতাংশই তরুণ, সংখ্যায় যা ৫ কোটি ৫৬ লাখেরও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা।
অন্যদিকে, ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি এবার নির্বাচনী ময়দানে নেই। ফলে দলটির সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী ১ হাজার ৯৭৬ জন। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর মধ্যে:
বিএনপি: ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ২৯০টি আসনে লড়ছে।
জামায়াত-১১ দলীয় জোট: জামায়াত ২২৩টি আসনে ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে লড়ছে। মিত্র এনসিপি ৩২টি আসনে লড়ছে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে।
জাতীয় পার্টি (জেপি): ১৯২টি আসনে ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে মাঠে আছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ‘হাতপাখা’ প্রতীকে লড়ছে ২৫৯টি আসনে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী: নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন ২৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ১৯টি দেশ থেকে এসেছেন ৫৪০ জন বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ৫৫ হাজার পর্যবেক্ষকও মাঠে থাকছেন। প্রথমবারের মতো এবার প্রবাসী ও কারাবন্দিদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৭ লাখ ৩০ হাজার ভোট জমা পড়েছে।
“আমরা একটি স্বচ্ছ ও সুন্দর নির্বাচন দিয়ে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।” — অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও ইসি
সব বাধা কাটিয়ে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ নতুন এক যাত্রায় শামিল হতে যাচ্ছে। সবার অপেক্ষা এখন একটিই—বিকেলের শেষ সূর্য ডোবার সাথে সাথে কারা হাসবেন শেষ হাসি।

