দীর্ঘদিনের আসন পুনরুদ্ধার করতে পারল না বিএনপি, দলীয় বিভাজন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ ও সংকটে কেশবপুরে বিএনপির পরাজয়

0
দীর্ঘদিনের আসন পুনরুদ্ধার করতে পারল না বিএনপি, দলীয় বিভাজন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ ও সংকটে কেশবপুরে বিএনপির পরাজয়

কেশবপুর প্রতিনিধি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের প্রত্যাশা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সেই আশা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, তৃণমূল নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে দলীয় কোন্দল, অভ্যন্তরীণ বিরোধ, কর্মীদের অসন্তোষ, নির্বাচনের আগে সাংগঠনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কিছু নেতাকর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ডই মূলত এই পরাজয়ের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ আসন : যশোর-৬ আসনটি দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক এলাকা। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিসব বড় দলই এখানে বিজয়ের স্বাদ পেয়েছে। ১৯৭৯ সালে কেশবপুরকে কেন্দ্র করে আসন পুনর্গঠনের পর বিএনপির গাজী এরশাদ আলী বিজয়ী হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন জয়ী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এএসএইচকে সাদেক প্রায় ৫৭ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল ওহাব ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৯৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদ পান ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৭ ভোট। প্রায় ৪৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপি পরাজিত হয়। পরবর্তীতে সীমানা পুনর্নিধারণ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আসনটি দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপি এই আসন পুনরুদ্ধারের বড় সুযোগ দেখেছিল। প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবতা ভিন্ন: নির্বাচনের শুরুতে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেলেও ভোটের শেষ সময়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের গ্রুপিং নির্বাচনের সময়ও পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেক কর্মী অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে সব পক্ষকে একত্র করে মতবিরোধ মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকাশ্যে একসাথে কাজ করলেও ভেতরে ভেতরে বিভক্তি থেকেই যায়। কেউ কেউ নিষ্কিক্রয় ছিলেন, আবার কেউ নীরবে বিরোধিতা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কর্মীদের অভিমান ও নেতৃত্বের দূরত্ব: তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা অনেক কর্মী যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত দ্বন্ধ ও পুরোনো বিরোধ মীমাংসা না হওয়ায় নির্বাচনী ঐক্য গড়ে ওঠেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে দলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে অতিরিক্ত কয়েক হাজার ভোট বিএনপির পক্ষে যেতে পারত। বিতর্কিত কর্মকান্ডের নেতিবাচক প্রভাব : ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাটি ব্যবসা, জমি দখলসহ নানা অভিযোগ ওঠে যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। ভোটারদের একটি অংশ জানান, এসব কর্মকান্ডের কারণে সাধারণ মানুষ বিরক্ত হয়ে পড়েন এবং অনেকেই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন বা বিকল্প প্রার্থীর দিকে ঝুঁঁকে পড়েন। প্রচারণায় অর্থের প্রভাব, সংগঠনে ঘাটতি: নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে প্রচারণায় অর্থ ব্যয়ের আলোচনা বেশি হলেও মাঠপর্যায়ে ভোটার সংযোগ তুলনামূলক দুর্বল ছিল বলে স্থানীয়দের মত। অনেক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, বাস্তব সাংগঠনিক কাজের চেয়ে অর্থকেন্দ্রিক রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যক্তিগত ইমেজ বনাম দলীয় বাস্তবতা : স্থানীয়দের মতে, বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নিয়ে বড় অভিযোগ না থাকলেও দলীয় বিভাজন তার বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রার্থীর প্রতি সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও সংগঠনের ভাঙন নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

স্থানীয়দের মতে, কেশবপুরের সাবেক এমপি গাজী এরশাদের পরিবারের সাথে দীর্ঘদিনের দ্বন্ধ রয়েছে আবুল হোসেন আজাদের। এখানে বিএনপির ভোটের একটি অংশ (ধানের শীষ) থেকে বঞ্চিত। প্রতিপক্ষের সংগঠিত ভোটব্যাংক : অন্যদিকে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিকভাবে মাঠে সক্রিয় থাকায় ভোটব্যাংক ধরে রাখতে সক্ষম হন। বিশেষ করে ইউনিয়নভিত্তিক সংগঠন ও কর্মী সমন্বয় তুলনামূলক শক্তিশালী ছিল বলে স্থানীয়রা মনে করেন।

ভোটার ইস্যুতে পিছিয়ে পড়া: কেশবপুরের প্রধান সমস্যা হিসেবে জলাবদ্ধতা, নদী-খাল ভরাট, কৃষি ক্ষতি ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। ভোটারদের একটি অংশ মনে করেন, এসব বাস্তব সমস্যার সমাধান নিয়ে সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা তুলে ধরতে না পারাও বিএনপির জন্য নেতিবাচক হয়েছে। বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন: রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেশবপুরে বিএনপির পরাজয় কোনো একক কারণে হয়নি বরং কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করেছে দলীয় গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ, তৃণমূল কর্মীদের অসন্তোষ, নির্বাচনের আগে সমন্বয়হীনতা, কিছু নেতাকর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ড।

মাঠপর্যায়ে দুর্বল সাংগঠনিক কার্যক্রম, প্রতিপক্ষের শক্ত সংগঠন, সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। স্থানীয় রাজনীতিবিদরা মনে করছেন, কেশবপুরে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হলে বিএনপিকে প্রথমেই দলীয় ঐক্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃণমূলকে মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ নিরসন এবং জনসস্পৃক্ত রাজনীতিতে ফিরে আসাই হতে পারে ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের প্রধান শর্ত। কেশবপুর বাসি চাই বিএনপি পূর্বের স্থানে ফিরে আসুন। উল্লেখ্য থাকে যে, কেশবপুরে বিএনপ্#ি৩৯;র প্রাণপ্রিয় নেতা সাবেক এমপি মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন নেতাকর্মীদের পুনজ্জীবিত করে রাখছিলেন। নেতা কর্মীদের মূল্যায়ন তাদের সমস্যা সবকিছু সমাধান করতেন।

পুরো দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের একজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন কেশবপুরের সাবেক এমপি মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন এবং ৩ নং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু বকর আবু। নেতাকর্মীদের প্রতি তাদের অসীম ভালোবাসা কখনো ভুলতে পারেনি কেশবপুরে সর্বস্তরে জনগণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি’র এক নেতার মতে, নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন না করলে সে দল বা সংগঠন কখনও ঠিকে থাকে না। তাঁর প্রমান এই ত্রয়োদশ নির্বাচন। কারণ একটি দলের প্রধান হাতিয়ার কর্মী।

কর্মী মূল্যায়ন ছাড়া দল তাঁদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। প্রতিযোগিতা, মতভেদ ও সংগ্রামের মধ্যেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সেই বাস্তবতায় বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করা নয় বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। তৃণমূলের কর্মীদের ঐক্য, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং জনমুখী কর্মসূচিই পারে কেশবপুরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে। সময়ের দাবি বুঝে যদি দল সংগঠিতভাবে এগিয়ে যেতে পারে, তবে কেশবপুরে বিএনপির রাজনীতি আবারও শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশাই করছেন সাধারণ ভোটাররা।