যে নেতাকে মনে রেখেছে কেশবপুরের মানুষ ভুলে গেছে রাজনীতি

0
যে নেতাকে মনে রেখেছে কেশবপুরের মানুষ ভুলে গেছে রাজনীতি

কেশবপুর প্রতিনিধি: ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক স্মৃতি মুছে যায়, অনেক নাম হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে। অথচ কিছু মানুষ ছিলেন, যাদের জীবন ও কর্ম একটি জনপদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসকে গড়ে দিয়েছে। তেমনই এক নাম কেশবপুরের প্রয়ত জননেতা গাজী এরশাদ আলী যার অবদান আজও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকলেও আনুষ্ঠানিক স্মরণে ক্রমেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক সময় পার করে যখন দেশ নতুন পথে এগোতে শুরু করে, তখন যশোর অঞ্চলের রাজনীতিতেও নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মনোনয়নে যশোর-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কেশবপুরে বিএনপির প্রথম নির্বাচিত এমপি হিসেবে তার বিজয় শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না এটি ছিল সাধারণ মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন। তখনকার রাজনীতি ছিল ভিন্ন দলীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল নেতৃত্বের মূল পরিচয়। গাজী এরশাদ আলী ক্ষমতার দূরত্ব তৈরি করেননি বরং মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়েছেন। গ্রামের রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় অবকাঠামো কিংবা সামাজিক বিরোধ সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সহজপ্রাপ্য একজন প্রতিনিধি। অনেকেই আজও স্মরণ করেন, দরজায় কড়া নাড়লেই তিনি মানুষের কথা শুনতেন। কেশবপুরের বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষাবিস্তারে তার উদ্যোগ একটি পিছিয়ে পড়া জনপদকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। স্থানীয়ভাবে ‘গাজীর মোড়’ নামে পরিচিত একটি স্থানের নামকরণও মানুষের ভালোবাসারই প্রতীক যা কোনো সরকারি ঘোষণার নয়, জনগণের হৃদয়ের স্বীকৃতি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আমরা যেন আমাদের ইতিহাস ভূলতে বসেছি। আজ কেশবপুরে নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও স্মরণানুষ্ঠান হলেও এই জননেতার নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না এই অঞ্চলে একটি রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার পেছনে কারা পথ তৈরি করেছিলেন।

রাজনীতির এই বিস্মৃতি কেবল একজন ব্যক্তিকে অবমূল্যায়ন নয় এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অবক্ষয়ের প্রতিফলন। বর্তমান সময়ে রাজনীতি অনেকাংশে ব্যক্তি ও স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যেখানে আদর্শের চেয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে অবস্থান ও প্রভাব। ফলে যারা মানুষের জন্য রাজনীতি করেছিলেন, তাদের স্মৃতি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে। এ কারণেই হয়তো আজ কিছু রাজনৈতিক দল জনসম্পৃক্ততা হারিয়ে ভাটার টানে পড়ছে। ইতিহাসকে অস্বীকার করে বা পূর্বসূরিদের অবদান ভুলে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক ধারা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। একটি সমাজ তখনই পরিপক্ব হয়, যখন সে তার অতীতকে সম্মান করতে শেখে। গাজী এরশাদ আলীর মতো নেতাদের স্মরণ করা মানে শুধু একজন মানুষকে শ্রদ্ধা জানানো নয় বরং একটি মূল্যবোধকে জীবিত রাখা মানুষকেন্দ্রিক রাজনীতির মূল্যবোধ।

তার মৃত্যুবার্ষিকী এলে কিছু প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণে তার নাম ভেসে ওঠে কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করার উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। হয়তো সময় এসেছে নতুন করে ভাবার আমরা কাদের অনুসরণ করছি এবং কাদের ভুলে যাচ্ছি। জননেতারা মৃত্যু মাধ্যমে হারিয়ে যান না তারা হারিয়ে যান তখনই, যখন সমাজ তাদের স্মৃতি ভুলে যায়। কেশবপুর কি তবে তার এক সময়ের প্রাণের মানুষকে সত্যিই ভুলে যেতে বসেছে? এই প্রশ্নই আজ আমাদের সামনে রেখে যায় ইতিহাস। ই-মেইলে ছবি আছে