উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছেঃ রংপুরে বিশেষজ্ঞ বক্তারা 

0
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছেঃ রংপুরে বিশেষঞ্জ বক্তারা

জয়নাল আবেদীনঃ বিশ্বব্যাপী নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অনিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার কারণে দিন দিন বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। “একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রংপুরে ফৃ মেডিকেল ক্যাম্প এবং আলোচনা সভার মধ্যে দিয়ে দিবসটি পালিত হয়েছে ।

দেশের একমাত্র গবেষণা ধর্মী প্রতিষ্ঠান রংপুরের হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার আয়োজনে অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার, স্বাস্থ্যকর্মী, বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, সেবাকর্মী, শিক্ষার্থীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার ৩শ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের জনক দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মুহঃ জহুরুল হক ,মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মোখলেছুর রহমান সরকার আইআরবি বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ডা. শাহ্ মো. সরওয়ার জাহান, সাধারণ সম্পাদক ডা. এ .এস.এম. রাহেনুল মন্ডল আপেল, নির্বাহী সদস্য ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের উপ-মহাব্যস্থাপক মাহিদুল ইসলাম সুজন সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু।

আলোচনা সভায় হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রংপুর-এর সিইও মো. আনোয়ার হোসেন একটি তথ্যবহুল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি উচ্চ রক্তচাপের কারণ, ঝুঁকি, লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

প্রেজেন্টেশনে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও তাদের অনেকেই এ বিষয়ে সচেতন নন। ফলে নীরবে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও তুলে ধরেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ফাস্টফুড নির্ভরতা, ধূমপান, মানসিক চাপ, স্থূলতা, অনিয়মিত ঘুম এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ অবহেলা করলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা ও ব্রেইন হেমোরেজের মতো প্রাণঘাতী সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং তিনি উল্লেখ করেন, গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে ।

বক্তারা বলেন, উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি রোগ যা অনেক সময় কোনো ধরনের দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। এ কারণে একে “নীরব ঘাতক” বলা হয়। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি বিকল, ব্রেইন হেমোরেজ, দৃষ্টিশক্তি হ্রাসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে শুধু শহরাঞ্চল নয়, গ্রামাঞ্চলেও উচ্চ রক্তচাপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন বক্তারা। বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফাস্টফুড নির্ভরতা, রাতজাগা অভ্যাস এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধিকে ভবিষ্যতে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. মুহঃ জহুরুল হক বলেন বর্তমান সময়ে উচ্চ রক্তচাপ শুধু বয়স্কদের রোগ নয়, তরুণদের মধ্যেও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে বড় ধরনের জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি বলেন অনেক মানুষ জানেনই না যে তারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। তাই প্রত্যেকের উচিত নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্তচাপ পরীক্ষা করা। সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই পারে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে।” সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, “উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস বর্তমানে দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এসব রোগে আক্রান্ত থাকলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তা জানতে পারেন না। হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রংপুর দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তার এই প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ৩শ২২টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প সম্পন্ন করেছে। এসব ক্যাম্পে বিনামূল্যে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক আলোচনা করা হয়েছে।

”অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন জানান, গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ আগে থেকেই জানতেন না যে তারা উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জীবনযাপনে পরিবর্তন, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।তিনি বলেন, হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার শুধু চিকিৎসা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ, নিয়মিত ফলোআপ এবং গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে একটি সুস্থ সমাজ গঠনে কাজ করে যাচ্ছে।