
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে তিন মাসের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো বেকার হয়ে পড়া জেলে পরিবারগুলোর জন্য ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের দাবির পর এ খাদ্য সহায়তা পেয়ে উপকূলীয় এলাকার জেলে পরিবারগুলো স্বস্তি প্রকাশ করলেও তালিকার বাইরে থাকা অনেক প্রকৃত জেলে পরিবার ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গত ১৬ জুলাই বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার ১২টি উপজেলার সুন্দরবন-নির্ভর তালিকাভুক্ত ৮ হাজার ২৭১টি জেলে পরিবারের জন্য ৬৬১ দশমিক ৬৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনে মাছ ধরার ওপর আরোপিত তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া জেলে পরিবারগুলোর খাদ্য সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে ২০২০ সালের ২৮ জুলাই থেকে প্রতিবছর জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানে সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। ফলে প্রতি বছর এই সময় সুন্দরবন-নির্ভর হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবী কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং তাদের পরিবারকে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।
এবারের বরাদ্দ অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রতিটি জেলে পরিবার জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে মাসিক ৪০ কেজি করে মোট ৮০ কেজি চাল পাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি হয়তো সব সংকটের সমাধান নয়, তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে তালিকাভুক্ত জেলের সংখ্যা ৮ হাজার ৫৪০ জন। অপরদিকে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে তালিকাভুক্ত জেলের সংখ্যা ৯ হাজার ৪০০ জন। সেই হিসাবে মোট নিবন্ধিত জেলের তুলনায় খাদ্য সহায়তা পাওয়া পরিবারের সংখ্যা এখনও সীমিত।
তালিকা প্রণয়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বাগেরহাট জেলা জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের সভাপতি মো. দুলাল ফরাজী বলেন, “পূর্ব সুন্দরবন-নির্ভর অনেক প্রকৃত জেলে পরিবার বন বিভাগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষ করে শরণখোলা উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের বহু জেলে বাদ পড়েছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মৎস্য বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। আমরা দ্রুত বাদ পড়া জেলে পরিবারগুলোকে তালিকাভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যে প্রথমবারের মতো খাদ্য সহায়তা দিয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।”
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “অনেক আবেদন ও লেখালেখির পর বর্তমান সরকার প্রথমবারের মতো সুন্দরবন-নির্ভর বেকার জেলে পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ করেছে। এতে জেলে পরিবারগুলো উপকৃত হবে। তবে তালিকাভুক্ত জেলের সংখ্যার তুলনায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা এখনও কম। আশা করছি, আগামীতে আরও বেশি জেলে পরিবারকে এই সহায়তার আওতায় আনা সম্ভব হবে।”
স্থানীয় জেলে সংগঠনের নেতারা মনে করছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয় হলেও এই সময়ে জেলে পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, ভিজিএফ চাল বরাদ্দ একটি ইতিবাচক সূচনা হলেও প্রকৃত সব জেলে পরিবারকে সহায়তার আওতায় না আনা পর্যন্ত সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না।
দীর্ঘদিনের দাবির পর প্রথমবারের মতো পাওয়া এই খাদ্য সহায়তা সুন্দরবন-নির্ভর জেলে পরিবারগুলোর মাঝে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। তবে তালিকা থেকে বাদ পড়া পরিবারগুলোর অন্তর্ভুক্তি এবং সহায়তার পরিধি বৃদ্ধির দাবি এখন উপকূলজুড়ে আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
