
রাজশাহী প্রতিবেদক: রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। তবে সরকারি নথিপত্রে দেখা গেছে, নিয়োগ কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের লিখিত নির্দেশনা, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) অনুমোদন এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। ফলে বহুস্তরের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন শুধু মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, গত ২৩ জুন ২০২৬ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় দেশের সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগসংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। একই দিনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) ই-জিপির পরিবর্তে অফলাইনে ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) অনুসরণের অনুমোদন দেয়। নির্দেশনায় ৩০ জুনের মধ্যে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বলা হয়। পরবর্তীতে ২৪ জুন মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদন, ২৫ জুন দরপত্র আহ্বান, ২৭ জুন মূল্যায়ন কমিটির সভা ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন, এবং ২৯ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুমোদনের পর কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডকে কার্যাদেশ (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেওয়া হয়। একই দিনে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে ৫ জন চালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ৬৯ জন নিরাপত্তা প্রহরীসহ মোট ১৪৩ জন জনবল সরবরাহের দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি।
ইসি সচিবালয়ের পৃথক নির্দেশনায় আগে থেকেই কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। সে অনুযায়ী ১৩৭ জন কর্মরত কর্মীর তালিকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি ১৪৩ জনের চূড়ান্ত তালিকা জমা দিলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে তারা কর্মস্থলে যোগ দেন। সম্প্রতি একটি ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে এবং কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় মোঃ আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করে। তবে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্রে ঘুষের অভিযোগের সমর্থনে কোনো লিখিত প্রমাণ, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগ উত্থাপনকারী প্রতিবেদনে অর্থ লেনদেনের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথিও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখন তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গত ২১ জুলাই জারি করা আদেশে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) ডিএম আতিকুর রহমানকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ২০ জুলাই জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানায়, সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী জনস্বার্থে মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় কার্যক্রম চলাকালে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন। এদিকে নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মী ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত আউটসোর্সিং চালক ইসমাইল হোসেন বলেন, তিনি ২০১৬ সাল থেকে কর্মরত এবং চলতি বছরের জুলাইয়ে নতুন যোগদানপত্র পেয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।
বোয়ালিয়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ফারুক হোসেন জানান, তিনি ২০২৩ সালে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিমালা অনুযায়ী পুনরায় নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর কাছ থেকেও কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন রাজপাড়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাব্বির হোসেন। কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসাইন বলেন, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই আগের কর্মীদের বহাল রেখে চুক্তি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান নিজ¯^ভাবে কোনো তালিকা ˆতরি করেনি। তিনি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের অগোচরে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নিয়ে থাকলে তার দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ আনিছুর রহমান দাবি করেন, সরকার নির্ধারিত নীতিমালা ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই পুরো নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম হয়নি।
