নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সুন্দরবনে বিষের মহোৎসব গভীর বনে চিংড়ি শিকার করে শুঁটকি তৈরির গোপন আস্তানা

0
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সুন্দরবনে বিষের মহোৎসব গভীর বনে চিংড়ি শিকার করে শুঁটকি তৈরির গোপন আস্তানা

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির:সুন্দরবনে তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে। কাগজে-কলমে বন্ধ সুন্দরবনে প্রবেশ, বন্ধ মাছ ও বনজ সম্পদ আহরণ। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বন বিভাগের নজরদারির মধ্যেই গভীর সুন্দরবনে গড়ে উঠেছে অবৈধ শুঁটকি তৈরির আস্তানা। সেখানে কীটনাশক ব্যবহার করে চিংড়ি শিকার করা হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে শুঁটকি, আর নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র।

গত ৪৮ ঘণ্টায় পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে পৃথক অভিযানে চারটি অবৈধ শুঁটকির মাচা (টংঘর) ধ্বংস করেছে বন বিভাগ। একই সঙ্গে জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ শুঁটকি ও তাজা চিংড়ি, কীটনাশক, মাছ ধরার জাল, অবৈধ কাঁকড়া ধরার চারু, সাতটি নৌকা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম। তবে অভিযানের আগেই পালিয়ে যায় জড়িতরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিষিদ্ধ সময়ে সুন্দরবনের ভেতরে এত বড় আকারে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া শুধু বন আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়, বরং এটি নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, শুক্রবার (৩১ জুলাই) শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে শেলার চর টহল ফাঁড়ির আওতাধীন কালামিয়া ও নারকেলবাড়িয়া খাল এলাকায় অভিযান চালানো হয়। দুর্গম বনাঞ্চলের ভেতরে অবৈধভাবে নির্মিত একটি শুঁটকির মাচা থেকে উদ্ধার করা হয় দুই বস্তা শুঁটকি চিংড়ি, একটি নৌকা, দুটি টোনা জাল ও একটি মোবাইল ফোন।

বনরক্ষীদের উপস্থিতি টের পেয়ে জেলেরা বনের গভীরে পালিয়ে যায়। পরে মাচাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

একই দিন বিকেলে কোকিলমুনি ফাঁড়ির কবরখালী খাল এলাকায় আরেক অভিযানে চারটি জেলে নৌকা ও ১৫টি চর জাল জব্দ করা হয়। সেখানেও বনরক্ষীদের দেখেই পালিয়ে যায় জেলেরা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে এত সংখ্যক নৌকা, জাল ও জেলেরা কীভাবে বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল? বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের অভ্যন্তরেও নানা আলোচনা চলছে।

এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে কাগা খাল, ইন্দুরকানী খাল ও হরমাল খাল এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়।

হরমাল খালের কাছে একটি মাচা থেকে উদ্ধার করা হয় দুই বস্তা শুঁটকি চিংড়ি, পাঁচ বস্তা তাজা চিংড়ি, দুটি নৌকা, দুটি টুনা জাল, দুই লিটার কীটনাশক এবং তিন বস্তা চাল। এছাড়া একটি নৌকা থেকে জব্দ করা হয় কাঁকড়া ধরার ৯৫টি অবৈধ চারু।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার হওয়া কীটনাশকই প্রমাণ করে যে বনের জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ও চিংড়ি শিকার করা হচ্ছিল। এটি শুধু বেআইনি নয়, বরং পরিবেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

পরিবেশবিদদের মতে, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার সুন্দরবনের জন্য এক ‘নীরব মহাবিপর্যয়’।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর সমন্বয়ক নুর আলম বলেন, “কীটনাশক পানিতে মিশে অসংখ্য মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীকে হত্যা করছে। এর ফলে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।”

তিনি বলেন, “বাঘ, কুমির, ডলফিন, জলচর পাখি—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই খাদ্যচক্রের সঙ্গে যুক্ত। বিষের ব্যবহার পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, নিষিদ্ধ সময়ে গভীর বনের মধ্যে শুঁটকির মাচা নির্মাণ, বিপুল পরিমাণ চিংড়ি সংগ্রহ, খাদ্য মজুত এবং বিষ ব্যবহার—এসব কার্যক্রম একদিনে সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে সংঘবদ্ধভাবে এসব কর্মকাণ্ড চলেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

তাদের মতে, বন বিভাগের নিয়মিত টহল ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী না হলে এবং বন অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা কঠিন হবে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যেই কিছু অসাধু জেলে বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে অবৈধভাবে শুঁটকির মাচা নির্মাণ এবং বিষ দিয়ে চিংড়ি শিকার করছিল। অভিযানে এসব স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বন অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপের মধ্যেই টিকে থাকার সংগ্রাম করছে সুন্দরবন। এর মধ্যে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার ও অবৈধ সম্পদ আহরণ চলতে থাকলে বনটির পরিবেশগত ভারসাম্য আরও বড় হুমকির মুখে পড়বে।

তাদের দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে সরঞ্জাম জব্দ করলেই হবে না; বরং এই চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে রক্ষার প্রচেষ্টা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।