আমাদের সমাজে এবং বাংলা সিনেমায় একটি দৃশ্য খুবই পরিচিত—সন্তান পিতা-মাতার অবাধ্য হলে বা অপছন্দের কাউকে বিয়ে করলে বাবা রাগের মাথায় সন্তানকে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ ঘোষণা করেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, এ ধরনের কোনো ঘোষণা বা এফিডেভিট করলে সন্তান পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত হয়।
তবে বাস্তব আইনি সত্য হলো বাংলাদেশের প্রচলিত কোনো আইনি কাঠামোতেই ‘ত্যাজ্যপুত্র’ বা সন্তানকে ত্যাজ্য করার কোনো সুযোগ বা বৈধতা নেই।
ইসলামী শরীয়াহ ও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, উত্তরাধিকার বা মিরাস কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছাধীন বিষয় নয়; এটি আল্লাহ প্রদত্ত এক নির্ধারিত আইনি স্বত্ব।
কোনো পিতা যদি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বা মৌখিকভাবে কোনো সন্তানকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন, তবে আইনগতভাবে তার কোনো মূল্য বা কার্যকারিতা নেই। পিতার মৃত্যুর পর রক্তসম্পর্কীয় স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হিসেবে সেই অবাধ্য বা ত্যাজ্য সন্তানও অন্য ভাই-বোনদের মতোই পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তির আইনগত অংশ পাবে।
একজন পিতা বেঁচে থাকা অবস্থায় কেবল মুখের কথায় বা হলফনামা দিয়ে কাউকে ‘ত্যাজ্য’ করতে না পারলেও, নিজের অর্জিত বা মালিকানাধীন সম্পত্তি হস্তান্তর করার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে। জীবদ্দশায় পিতা যদি কৌশলগতভাবে নিজের সম্পত্তি অন্য কারো নামে হস্তান্তর করে যান, তবেই কেবল কোনো নির্দিষ্ট সন্তান সম্পত্তি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
হেবা বা দান (Gift) পিতা তার জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ সম্পত্তি অন্য কোনো সন্তান, স্ত্রী বা যেকোনো ব্যক্তির নামে ‘হেবা’ বা দান দলিল করে রেজিস্ট্রি করে দিতে পারেন। মৃত্যুর পর পিতার নামে কোনো সম্পত্তি না থাকায় অবাধ্য সন্তান কিছুই পাবে না।
বিক্রি (Sale) পিতা তার সম্পত্তি যেকোনো তৃতীয় ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন। বিক্রি হয়ে গেলে তা আর পৈতৃক সম্পত্তি থাকে না।
ওয়াকফ (Waqf) পিতা তার সম্পত্তি ধর্মীয় বা জনকল্যাণকর কাজে ‘ওয়াকফ’ করে দিতে পারেন এবং অন্য কাউকে তার মুতোয়াল্লী (তত্ত্বাবধায়ক) নিয়োগ করতে পারেন। আইনি মালিকানা ওয়াকফ এস্টেটের অধীনে চলে যায়।
ওছিয়ত বা উইল (Will) পিতা মৃত্যুর আগে তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ) যেকোনো অ-উত্তরাধিকারীর নামে ওছিয়ত করে যেতে পারেন। বাকি ২/৩ অংশ বাধ্যতামূলকভাবে সব আইনি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে।
সাধারণ অবাধ্যতা বা ত্যাজ্য ঘোষণার কারণে উত্তরাধিকার নষ্ট না হলেও, মুসলিম আইনে কেবল একটি নির্দিষ্ট অপরাধের কারণে সন্তান পিতার সম্পত্তির অধিকার হারাতে পারে:
পিতৃহত্যা বা নরহত্যা (Homicide): কোনো সন্তান যদি সম্পত্তি পাওয়ার লোভে বা অন্য যেকোনো কারণে নিজ পিতাকে হত্যা করে বা হত্যায় সহায়তা করে, তবে মুসলিম আইন অনুযায়ী সে সরাসরি পিতার মিরাস বা উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত (Barred) হবে।
অনেক পিতা উষ্মা প্রকাশ করতে বা আইনি দায় এড়াতে পত্রিকায় বা নোটারির মাধ্যমে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। দেওয়ানি দায়: এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সম্পত্তির উত্তরাধিকার বন্ধ হয় না। অর্থঋণের দায়: সন্তান যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় বা কোনো অপরাধ করে, তবে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সেই ব্যক্তিক অপরাধ বা ঋণের দায় এমনিতেও পিতার ওপর বর্তায় না। ফলে এর জন্য ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণার আইনি প্রয়োজন নেই।
সামাজিকভাবে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ শব্দটি প্রচলিত থাকলেও আইনি দলিল হিসেবে এর কোনো ভিত্তি নেই। কোনো সন্তানকে সম্পত্তি না দিতে চাইলে পিতাকে অবশ্যই তার জীবদ্দশাতেই রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি অন্য কারো নামে হস্তান্তর করে যেতে হবে। পিতা তা না করে মৃত্যুবরণ করলে, অবাধ্য সন্তানও আইনত সমানভাবে সম্পত্তির অংশীদার হবে।
সাইফুল আলম
লেখকঃ আইনজীবী
০১৭১১৯৪২২৯৪, [email protected]

