পানগুছি নদীর ভাঙনে হুমকির মুখে জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ২০–২৫ বছরের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দুই হাজার পরিবার

0
পানগুছি নদীর ভাঙনে হুমকির মুখে জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ২০–২৫ বছরের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দুই হাজার পরিবার

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনঘেঁষা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বারইখালী ইউনিয়নে পানগুছি নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম হুমকির মুখে পড়েছে জনবসতি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে ইতোমধ্যে বসতবাড়ি ও বাপ-দাদার জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অসংখ্য পরিবার। এখন নদীর তীব্র স্রোতে বারইখালী ফেরিঘাট থেকে ঘসিয়াখালী অভিমুখী প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ইট সোলিং সড়কটিও বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ২০–২৫ বছর ধরে বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বারইখালী গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানগুছি নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে প্রায় দুই হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীগর্ভে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি জমিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর বর্ষা ও জোয়ারের সময় পানগুছি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে তীরবর্তী এলাকায় প্লাবন সৃষ্টি করে। তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের আঘাতে একের পর এক ভেঙে যাচ্ছে নদীর পাড়। এর ফলে ফসলি জমি, বসতভিটা, গাছপালা ও সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

এলাকাবাসীর দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজার একর ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। একসময় যে জমিতে কৃষকের ফসল ফলত, সেখানে এখন নদীর পানি। অনেক পরিবার একাধিকবার বসতবাড়ি সরিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় তাদের অনিশ্চয়তা কাটছে না।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বারইখালী ফেরিঘাট থেকে ঘসিয়াখালী অভিমুখী সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ইট সোলিং সড়ক নিয়ে। গত এক সপ্তাহ ধরে নদীর পানির তীব্র তোড়ে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, বারইখালী ও বহরবুনিয়া ইউনিয়নের সংযোগস্থলের এই সড়কটি তুলাতলা, কাশমীর, বারইখালী, উত্তর সুতালড়ী, এজিবি বাজার, ফুলহাতা ও ঘসিয়াখালী এলাকার মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান পথ। সড়কটি নদীগর্ভে চলে গেলে এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

তখন নদীপথই হয়ে উঠবে তাদের একমাত্র ভরসা। এতে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পায়নি স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও। ভাঙন অব্যাহত থাকলে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা ও পাঁচটি মসজিদ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ কারণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শুধু বসতবাড়ি ও সড়ক নয়, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

এলাকার বাসিন্দা কামাল শেখ, জালাল শেখ, আলম শেখ, ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নাজিম মাহমুদ জুয়েল, সংরক্ষিত ইউপি সদস্য মাসুমা আক্তার ও দিনমজুর আকলিমা বেগমসহ স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে তারা নদীভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন। প্রতিবছর বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়—কখন কার বসতভিটা বা জমি নদীগর্ভে চলে যায়।

তাদের ভাষ্য, অস্থায়ীভাবে মাটি ফেলে বা রাস্তা মেরামত করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নদীভাঙন ঠেকাতে পরিকল্পিত ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সড়কটি দ্রুত রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সমাজসেবক ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী রফিকুল ইসলাম মিঠু বলেন, বারইখালী ফেরিঘাট থেকে বহরবুনিয়া পর্যন্ত সড়কটি নদীভাঙনের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্থানীয়দের সহযোগিতা ও নিজ উদ্যোগে একাধিকবার সড়কটি মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু নদীর ভাঙন বন্ধ না হওয়ায় স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এখানে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা গেলে শুধু সড়ক নয়, হাজার হাজার মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবন-জীবিকাও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, বারইখালী ফেরিঘাটসংলগ্ন ইট সোলিং সড়কটি নতুন করে নির্মাণের আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর ফেরিঘাট থেকে ঘসিয়াখালী অভিমুখী ইট সোলিং ও কার্পেটিং সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রস্তাবনার পাশাপাশি দ্রুত বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারণ পানগুছি নদীর ভাঙন প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা গ্রাস করছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকা উপকূলের এই মানুষগুলোর দাবি একটাই—ত্রাণ নয়, সাময়িক মেরামত নয়; নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান ও একটি টেকসই বেড়িবাঁধ। তাদের মতে, পানগুছি নদীর ভাঙন রোধ করা গেলে রক্ষা পাবে জনবসতি, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা; ফিরে আসবে নদীপাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।