
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ কলকাতা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের (ফ্রি স্কুল স্ট্রিট) একটি বহু তলা ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গভীর রাতে লাগা এই আগুনে শিশু ও নারীসহ মোট ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যাদের সবাই বাংলাদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে। হতাহতদের অধিকাংশই ভারতে চিকিৎসা ও বাণিজ্যিক কাজে গিয়েছিলেন।
স্বল্প ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গে আবাসিক হোটেলে এটি দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনা। ১৭ আগস্ট বীরভূমের তারাপীঠের ‘হোটেল বিদেষিণী’-তে অগ্নিকাণ্ডে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতার এই বিপর্যয় প্রশাসনিক গাফিলতিকে পুনরায় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোররাত ৩টার দিকে ভবনের তিনতলায় থাকা একটি গেস্ট হাউসের এয়ার কন্ডিশনার (এসি) থেকে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আগুন সরাসরি সব জায়গায় না ছড়ালেও কয়েক মিনিটের মধ্যে বিষাক্ত ঘন ধোঁয়ায় পুরো ভবন ঢেকে যায়।
ফায়ার সার্ভিস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্য সমন্বয়ে ৪টি ইউনিট দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে সরু সিঁড়ি এবং ঘন ধোঁয়ার কারণে ফায়ার কর্মীদের উদ্ধারকাজে তীব্র বেগ পেতে হয়। পরবর্তীতে হোটেলের ঘরে ও শৌচাগারে আটকা পড়া মানুষদের বের করে আনা সম্ভব হলেও ৯ জনকে বাঁচানো যায়নি। ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তিন মন্ত্রী—অগ্নিমিত্রা পাল, তাপস রায় ও পূর্ণিমা চক্রবর্তী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
উদ্ধার পাওয়া বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতায় ভয়াবহতার চিত্র-
মোহাম্মদ আসাফুল জামাল (ব্যবসায়ী, ঢাকা): চারতলার ঘরে অবস্থানকালে চিৎকার শুনে তাদের ঘুম ভাঙে। দরজা খুলতেই পুরো ঘরে বিষাক্ত ধোঁয়া ঢোকে। নিচে নামার উপায় না দেখে ২০-২৫ জন অতিথিকে নিয়ে তারা চারতলার ছাদে গিয়ে ওয়াটার ট্যাঙ্কের পাশে অবস্থান নেন, যাতে আগুন এলে পানি দিয়ে তা ঠেকানো যায়।
মোহাম্মদ নাজমুল সরকার (হৃদরোগী, ঢাকা): চিকিৎসার জন্য সেখানে থাকা নাজমুল জানান, ধোঁয়ার তীব্রতায় একপর্যায়ে মারাত্মক অক্সিজেন সংকট দেখা দেয়। শ্বাস নিতে না পেরে তারা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।
কৌসর হোসেন (স্বপরিবার অতিথি): একতলার গেস্ট হাউসে থাকা কৌসর হোসেনকে হোটেল কর্মী ডেকে তুললে পরিবার নিয়ে বের হয়ে যান। তবে প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট ও কাগজপত্র আনতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পুনরায় কক্ষে ফেরেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ভবনটির অবকাঠামো ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার বহু অনিয়ম সামনে এসেছে বহুতল ভবনটিতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ছিল মাত্র একটি এবং তা অত্যন্ত সরু। কোনো আপৎকালীন জরুরি নির্গমন (Emergency Exit) ব্যবস্থা ছিল না। স্থানীয় সূত্রের মতে, মূল আবাসিক ভবনটিকে বেআইনিভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে একাধিক হোটেল ও গেস্ট হাউসে রূপান্তর করা হয়।
ঘর বাড়ানোর জন্য ভবনের ভেতরের পিলার কেটে দুর্বল করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। হোটেলের বাসিন্দা ও স্থানীয়দের দাবি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম বসানোর ব্যাপারে বারবার বলা হলেও হোটেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি।
আগুন বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং ভবনটি ঠান্ডা করার কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। একই সাথে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও লাইসেন্সসংক্রান্ত ত্রুটি তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
