এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদবাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার দৈবজ্ঞহাটী ইউনিয়নের গাবগাছিয়া গ্রামের একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। ইট সলিংয়ের সড়কটি এখন আর সড়ক নেই—বড় বড় খানাখন্দ, কাদা-পানি আর ভাঙাচোরা ইটের স্তূপে পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো সড়কটি কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় যানবাহন তো দূরের কথা, হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে যায়।
এতে শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১০টি গ্রামের হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন ভোগান্তি। অনেক সময় কাদা-পানিতে পা পিছলে পড়ে বই-খাতা ও পোশাক নষ্ট হচ্ছে। কেউ কেউ দুর্ঘটনার শিকারও হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ বছর ধরে রাস্তাটি সংস্কারের দাবি জানানো হলেও সরকারি পর্যায়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই এই সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দৈবজ্ঞহাটী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাবগাছিয়া গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির অধিকাংশ অংশের ইট উঠে গেছে। কোথাও কোথাও সামান্য ইটের অস্তিত্ব থাকলেও বেশিরভাগ জায়গাজুড়ে রয়েছে অসংখ্য গর্ত।
বর্ষা মৌসুমে এসব গর্তে জমে থাকে পানি। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও আবার কাদার নিচে থাকা গর্ত বুঝে ওঠার উপায় নেই। ফলে একটু অসতর্ক হলেই পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয়রা জানান, বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির এমন দুরবস্থা তৈরি হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বৃষ্টির সময় এই পথ প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
এই সড়ক দিয়েই প্রতিদিন ২০৭ নম্বর গাবগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪২ নম্বর বলইবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২৯ নম্বর উত্তর বলইবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী যাতায়াত করে।
বৃষ্টির দিনে তাদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী কাদায় পা পিছলে পড়ে যায়। বই-খাতা পানিতে ভিজে যায়, পোশাক কাদায় নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর আগেই শিক্ষার্থীদের বাড়িতে ফিরে যেতে হয়।
স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বৃষ্টির সময় সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে অভিভাবকরাও সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পান।
শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম, ইয়াসিন শেখ, জেরিন আক্তার ও আয়শা সিদ্দিকা জানায়, রাস্তার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে বৃষ্টির সময় বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে অনেক অভিভাবক শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না।
তাদের অভিযোগ, ভালোভাবে স্কুলে যেতে না পারায় অনেক সময় ক্লাস মিস হয়। বই-খাতা ও পোশাক কাদায় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। তাদের দাবি, দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হলে শিক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।
২০৭ নম্বর গাবগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাজমুল হক বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এই রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়। বৃষ্টির দিনে স্কুলে আসার পথে তাদের বই-খাতা ভিজে যায় এবং তারা চরম দুর্ভোগে পড়ে।
তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য রাস্তাটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। সড়কটি শুধু শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের পথ নয়, এটি আশপাশের প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
এই রাস্তা ব্যবহার করে প্রতিদিন বলইবুনিয়া, বুরুজবাড়িয়া, শহীদ মার্কেট, পুটিখালী, জোকা ও দৈবজ্ঞহাটি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন স্থানীয়রা।
কৃষকরা কৃষিপণ্য বাজারে নিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। রোগীকে হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হয় চরম ভোগান্তি। জরুরি প্রয়োজনে কোনো যানবাহন এই পথে ঢুকতে চাইলেও ঝুঁকি নিতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাদা-পানিতে রাস্তা ডুবে গেলে স্থানীয়দের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্থানীয় ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই এলাকার দুটি ভোটকেন্দ্রও রয়েছে। নির্বাচনের সময় ভোটারদের চলাচলের জন্য সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু বছরের পর বছর জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করেন, যে সড়কের সঙ্গে কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ নির্ভরশীল, সেই সড়কটি এতদিনেও কেন স্থায়ী সংস্কারের আওতায় আসেনি?
মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, সড়কটির দৈন্যদশা সম্পর্কে তারা অবহিত আছেন। সরকারি বরাদ্দের পরিপ্রেক্ষিতে রাস্তাটি নির্মাণ কিংবা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তার এই বক্তব্যে আশার আলো দেখছেন এলাকাবাসী। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাময়িক সংস্কার নয়, দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য সড়কটি কার্পেটিং করে নির্মাণ করা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর মতে, বারবার ইট ফেলে কিংবা মাটি দিয়ে খানাখন্দ ভরাট করে এই সড়কের স্থায়ী সমাধান হবে না। বর্ষা এলেই আবারও একই দুর্ভোগ ফিরে আসবে।
তাই তারা সড়কটি দ্রুত কার্পেটিং করে টেকসইভাবে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। এ জন্য বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্যের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন হাজারো মানুষ। একটি ভালো রাস্তা শুধু চলাচলের সুবিধা দেয় না—এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গাবগাছিয়ার এই সড়কটির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। রাস্তার বেহাল দশার কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে, কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে সমস্যায় পড়ছেন, অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে ভোগান্তি হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের চলাচল হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ।
তাদের প্রত্যাশা, আর কোনো বর্ষা যেন এভাবে দুর্ভোগ নিয়ে না আসে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বই-খাতা যেন আর কাদা-পানিতে না ভেজে। অসুস্থ রোগীকে যেন কাঁধে করে কাদার রাস্তা পার হতে না হয়। কৃষকের উৎপাদিত ফসল যেন ভাঙা রাস্তার কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হয়। তাই দ্রুত সরকারি বরাদ্দ দিয়ে গাবগাছিয়ার এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি কার্পেটিং করে নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।
হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে একটি নিরাপদ, টেকসই ও চলাচলযোগ্য সড়কই হতে পারে এই এলাকার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর।

