বন ও পরিবেশ রক্ষায় কুয়াকাটায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ম্যানগ্রোভ সম্মেলন

0
বন ও পরিবেশ রক্ষায় কুয়াকাটায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ম্যানগ্রোভ সম্মেলন

কলাপাড়া প্রতিবেদক: উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণে যুবসমাজকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বানের মধ্য দিয়ে কুয়াকাটায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘ম্যানগ্রোভ কনভেনশন’। রোববার (৩০ আগস্ট) কুয়াকাটার প্রেসিডেন্ট পার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে এ কনভেনশনের আয়োজন করা হয়। ইয়ুথ ফর ওশান (Y40)-এর উদ্যোগে এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, LEDARS ও বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)-এর সহযোগিতায় কনভেনশনটি অনুষ্ঠিত হয়।

সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনে ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তরুণদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরেন LEDARS-এর নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল। প্রধান অতিথি হিসেবে প্রথম সেশনে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া–রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এবিএম মোশাররফ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বন বিভাগের বরিশাল কোস্টাল সার্কেলের বন সংরক্ষক ড. মোল্লা রেজাউল করিম এবং কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার।

এছাড়া কনভেনশনে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ সংগঠন ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর কবির, পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া, কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। অপরদিকে সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ড মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক যুব সমাজ ও শিক্ষার্থীদের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রক্ষা সহ পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসার আহবান জানান।

ম্যানগ্রোভ রক্ষা না করলে সমুদ্র ও ভূমি হারানোর শঙ্কায় কনভেনশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, শিশুদের মাঝে ম্যানগ্রোভের গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে হবে। ম্যানগ্রোভ রক্ষা করতে না পারলে আমরা সমুদ্র ও ভূমি, সবই হারাবো।

তিনি আরো বলেন, উপকূলীয় পরিবেশ ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় ম্যানগ্রোভের গুরুত্ব অপরিসীম। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে এখন থেকেই সচেতন করতে হবে। শিশু ও তরুণদের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা গেলে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ম্যানগ্রোভের ভূমিকা নিয়ে কারিগরি অধিবেশন কনভেনশনের কারিগরি অধিবেশনে ‘পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জীবিকা রক্ষায় ম্যানগ্রোভের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের কারণ, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র এবং টেকসই উন্নয়নে সমুদ্র ও উপকূলীয় সাক্ষরতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অধিবেশনে সমুদ্রবিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, অ্যাকুয়াকালচার ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে কাজ করা শিক্ষক, গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা অংশ নেন। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসলেম উদ্দিন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. আশিকুর রহমানসহ অন্যরা।

উপকূলের বিভিন্ন এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তরুণরা। কনভেনশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্বে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার তরুণ প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার ম্যানগ্রোভ বন ও এর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার সম্পর্ক তুলে ধরেন। সাতক্ষীরা, খুলনা, পাথরঘাটা, তালতলী, বরগুনা, কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী, চকোরিয়া, মহেশখালী, সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়ার তরুণ প্রতিনিধিরা ম্যানগ্রোভের উপকারিতা, বন ধ্বংসের কারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

তরুণরা জানান, উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ম্যানগ্রোভের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি মাছ, কাঁকড়া, মধুসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করে।

আয়োজকেরা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ম্যানগ্রোভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ম্যানগ্রোভ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। তাই ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

দিনব্যাপী কনভেনশনের অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ম্যানগ্রোভ এলাকা পরিদর্শনেরও আয়োজন করা হয়। সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা উপকূলীয় বন ও পরিবেশের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের শিশু, তরুণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে উপকূল রক্ষায় একটি শক্তিশালী যুব নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।