রোহিঙ্গা সংকটের মূল মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে: জাতিসংঘে ৫ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

0
রোহিঙ্গা সংকটের মূল মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে: জাতিসংঘে ৫ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

কূটনৈতিক প্রতিবেদকঃ মিয়ানমারে তৈরি হওয়া রোহিঙ্গা সংকট অন্য দেশে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও দেশটির অভ্যন্তরেই নিহিত। বাংলাদেশের ওপর অন্যায্য আর্থিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাঝুঁকির বোঝা অনির্দিষ্টকালের জন্য চাপিয়ে দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি দ্রুত ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘে পাঁচ দফা জরুরি প্রস্তাব পেশ করেন।

আজ বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: আ রিনিউড কল ফর আ ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক যৌথ ইভেন্টে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে এ গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করে।

সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সাল এবং ১৯৮০-এর দশকজুড়ে রোহিঙ্গারা কয়েক দফায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। ওই সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বসম্মানে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।

তবে ২০১৭ সালের নৃশংসতার পর থেকে সংকট ভয়াবহ মাত্রা ধারণ করে। টানা নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আন্তর্জাতিক মানবিক দায় কাঁধে তুলে নিয়েছে। বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১২ লাখেরও বেশি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছে। মায়ানমারে চলমান সহিংসতার দরুন এখনো সেখান থেকে নতুন করে মানুষ পালিয়ে আসছে। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু জন্ম নেওয়ায় বাস্তুচ্যুতির শিকার হিসেবে যুক্ত হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজন্ম। প্রবীণরা জন্মভূমির স্মৃতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন এবং তরুণরা বড় হচ্ছেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে।

বাংলাদেশ সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও মানবতার খাতিরে সীমান্ত উন্মুক্ত করেছিল। বর্তমানে শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য, চিকিৎসা এবং প্রায় ৬,০০০ লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে শিক্ষার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। তরুণদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ, যাতে তারা নিজ দেশ রাখাইনে ফিরে গিয়ে পুনঃএকীভূত হতে পারে।

তবে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, মানবিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত থাকলেও আশ্রয়শিবিরগুলো কখনোই স্থায়ী বসবাসের উপযোগী স্থান হতে পারে না। এই দীর্ঘায়িত সংকটের কারণে স্থানীয় কক্সবাজারবাসীর ওপর প্রত্যক্ষ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক তহবিলের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে—যেখানে ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (JRP) ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চাওয়া হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমিয়ে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামাতে হয়েছে, যা কেবল জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চাহিদার জন্য যথেষ্ট।

মানবিক অর্থায়নের এই সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী হতাশা আঞ্চলিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র, মাদক ব্যবসা এবং বিপজ্জনক নৌযাত্রায় হাজার হাজার তরুণের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য মারাত্মক নিরাপত্তাজনিত হুমকি সৃষ্টি করছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের ওপর অব্যাহত নির্যাতন, জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ, চলাচলে বিধিনিষেধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে রোহিঙ্গারা তাদের নিজ ভূমিতে ফিরতে ভয় পাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গাম্বিয়ার আইনি লড়াই এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মানবিক সহায়তার উদারতা কোনো অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না।”

সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য বিশ্বনেতাদের সামনে পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী:

সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ: আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ও সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করা।

সহিংসতা বন্ধ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ: রাখাইন রাজ্যে বেসামরিক জনগণের ওপর নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করে প্রত্যাবাসনের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

পর্যাপ্ত মানবিক তহবিল: রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম জীবনধারনের জন্য টেকসই আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আশ্রয়দাতা স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জীবনমান রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে অর্থনৈতিক সমর্থন বজায় রাখা।

বিচার ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহি: মিয়ানমারে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপকর্মের দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতে ICJ, ICC সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থাকে পূর্ণ রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান।

স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসান: সংকট কেবল ‘ব্যবস্থাপনা’ না করে এর মূল উপড়ে ফেলা এবং বাস্তুচ্যুত অবস্থাকে চিরস্থায়ী না হতে দিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করা।

বক্তব্যের সমাপ্তিতে তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কখনোই চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল উদ্বাস্তু অবস্থায় বেঁচে থাকুক। বাংলাদেশ তার মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বিশ্বমঞ্চ থেকে তিনি আহ্বান জানান, “আসুন, আমরা একসঙ্গে নিশ্চিত করি—রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি করুণ গল্পে পরিণত না হয়; বরং তা যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।”