নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি ধাক্কায় সেনাসদস্যসহ নিহত ১৪, আহত ২৫: চালকের বদলে গাড়ি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার!

0
নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি ধাক্কায় সেনাসদস্যসহ নিহত ১৪, আহত ২৫: চালকের বদলে গাড়ি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার!

নাটোর প্রতিনিধিঃ নাটোরের বড়াইগ্রামে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক সেনাসদস্য, শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। দুর্ঘটনায় উভয় যানবাহনের চালকই প্রাণ হারিয়েছেন।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া (বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র সংলগ্ন) এলাকায় এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি ঘটে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা ‘আরপি পরিবহন’-এর বাসটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। অপরদিকে পঞ্চগড় থেকে ছেড়ে আসা বালুবোঝাই একটি ট্রাক ঝিনাইদহের অভিমুখে যাচ্ছিল।

বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম হোসেন জানান, ট্রাকটি মহাসড়কের নিজস্ব বাম পাশ ধরে স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। কিন্তু ওভারটেক করতে গিয়ে দ্রুতগতির আরপি পরিবহনের বাসটি লেন পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা ট্রাকটিকে সরাসরি সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার প্রচণ্ডতায় বাসের ডান পাশের অংশ ও ট্রাকের সামনের অংশ পুরো ধুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন মারা যান এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া বাসের যাত্রী রমজান আলী ও আব্দুস সালাম জানান বাসের ভেতরের আতঙ্কজনক পরিস্থিতির কথা।

“ঈশ্বরদী পার হওয়ার পর মূল চালক ও হেলপার পেছনের আসনে গিয়ে শুয়ে পড়েন। এরপর বাসের ড্রাইভিং সিটে বসেন সুপারভাইজার। তিনি প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং ঘন ঘন হঠাৎ কড়া ব্রেক কষছিলেন।”

যাত্রীরা আরও জানান, বাসটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ওঠানো হয়েছিল। ভেতরের গলিগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকায় পা ফেলারও জায়গা ছিল না। অদক্ষ হাতে ওভারটেকিং এবং অতিরিক্ত গতির কারণেই মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যায় ১৪টি তাজা প্রাণ।

নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি) শরীফুল ইসলাম জানান, নিহতদের মধ্যে নাটোর ক্যাম্পের এক সেনাসদস্য রয়েছেন। চিকিৎসাধীন ও নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে তারা হল মো. সোহেল রানা (৪০) পিতা- আব্দুল হাকিম, গ্রাম- ফরাদপুর, গোদাগাড়ী, রাজশাহী। আনোয়ার হক (৩০) পিতা- বাবর আলী, গ্রাম- চায়পাড়া, বাগমারা, রাজশাহী। তাসফিয়া (৮) পিতা- শহিদুল ইসলাম, গ্রাম- সুবিদ আলী, মির্জাগঞ্জ, পটুয়াখালী। শহিদুল ইসলাম (৪৫) পিতা- আজাহার হাওলাদার, গ্রাম- পূর্ব সুবিদখালী, মির্জাগঞ্জ, পটুয়াখালী।কালাম (৩৫) গ্রাম- বরানগড়, ঝিনাইদহ (পেশায় ট্রাকচালক)। জুয়েল (৪০) পিতা- জহর উদ্দিন, গ্রাম- রামকৃষ্ণপুর, জাজিরা, শরীয়তপুর। সালাল মোল্লা (৪৫) পিতা- জাহান উদ্দিন মোল্লা, গ্রাম- ডুবি সাহাবুর, জাজিরা, শরীয়তপুর। সোহাগ (৩০) পিতা- ইউনুস, গ্রাম- ডুবি সাহাবুর, জাজিরা, শরীয়তপুর। আব্দুস সামাদ (৭০) পিতা- আরব আলী ফকির, গ্রাম- ডুবি সাহাবুর, জাজিরা, শরীয়তপুর। শাহিন (৩৫) পিতা- রাজ্জাক, গ্রাম- কাজিরহাট, জাজিরা, শরীয়তপুর।

অবশিষ্ট ৪ জনের পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যবহারসহ স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ ও পিবিআই।

দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে প্রাথমিক উদ্ধারকাজ শুরু করেন। খবর পেয়ে নাটোর ও বড়াইগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের একাধিক টিম এবং পুলিশ এসে হতাহতদের উদ্ধার করে।

আহত ২৫ জনকে উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল, বড়াইগ্রামের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় কয়েকজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অন্তত ৭-৮ জনের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ভোর সকালেই ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর সদর আসনের এমপি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। নাটোর জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ খতিয়ে দেখতে ৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু শোকার্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রতিটি নিহত পরিবারকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কে ঘন ঘন দুর্ঘটনা রুখতে মহাসড়কটি দ্রুত ফোর-লেন বা প্রশস্ত করার বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ দুর্ঘটনার পর মহাসড়কটিতে কিছু সময়ের জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হলেও সকালে দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রাক সরিয়ে নেওয়ার পর ট্রাফিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়।