
কূটনৈতিক প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ ও জাপানের ৫০ বছরের পুরোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবার নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাল। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও আইনের শাসনের প্রতি জাপানের পূর্ণ সমর্থন এবং আগামী ৫ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন (জাপানি মুদ্রা) বিনিয়োগের পূর্বাভাসের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ঢাকা-টোকিও দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক।
চার দিনের সরকারি সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওস্থ জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কানতেই’-তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সানায়ে তাকাইচি। জাপান সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।
দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং দর্শনার্থী বইয়ে সই করেন। এরপর দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রতিনিধি দলীয় উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে বাস্তবমুখী করতে চারটি প্রধান ভিত্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাতের বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এর জন্য শিগগিরই একটি উচ্চপর্যায়ের জাপানি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানো হবে।
দুই দেশের সংযোগ রক্ষাকারী ঐতিহাসিক ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগকে নতুন মাত্রা দিয়ে ‘শেয়ারিং প্রসপারিটি বিগ-বি’ ফ্রেমে উন্নীত করা হয়েছে।
মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক (FOIP) অঞ্চল গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও সমুদ্র নিরাপত্তা বাড়াতে জাপান বাংলাদেশ নৌবাহিনী/কোস্টগার্ডকে টহল জাহাজ (Patrol Vessel) প্রদান করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (EPA) দ্রুত কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে, যা এলডিসি (LDC) উত্তরণের পর জাপানি বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখবে।
বৈঠক শেষে নিজের অফিসিয়াল ‘এক্স’ (টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এবং যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী বলেন “গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের অংশীদার বন্ধু হিসেবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের জাতি গঠনমূলক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় জাপান দৃঢ় ও জোরালো সমর্থন দেবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৭ কোটি মানুষের বিশাল ও উদীয়মান তরুণ জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করার এক কৌশলগত কেন্দ্রে অবস্থিত, যা জাপানের অর্থনীতির জন্যও ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অবদানের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যেসব দেশ প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, জাপান তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে জাপানের জন্য এক বিশেষ স্থান রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে জাপানের এই অবিচল সমর্থন আমাদের দুই দেশকে ‘যৌথ সমৃদ্ধি’র দিকে এগিয়ে নেবে।”
সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরসূচির অংশ হিসেবে আজ জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এবং একাধিক জাপানি শীর্ষ কর্পোরেট প্রধানের সাথে বিনিয়োগ বৈঠকে অংশ নেবেন।
