বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ অধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং মধ্যরাতে আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকার আজিমপুর এলাকা। অধ্যক্ষের অবরুদ্ধ অবস্থা এবং পুলিশের বিতর্কিত অভিযানের পর টানা দ্বিতীয় দিনের মতো শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল থেকেই আজিমপুরের মূল সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক হোম ইকোনমিক্স কলেজ) সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
অধ্যক্ষের পদত্যাগ ও হামলার সুষ্ঠু তদন্তসহ দুই দফা দাবি বাস্তবায়নে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট ভাষায় ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা (আল্টিমেটাম) বেঁধে দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অ্যাকাডেমিক সব কার্যক্রম বয়কট ও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
শুক্রবার সকাল ৮টা থেকেই শিক্ষার্থীরা কলেজের প্রধান ফটকের সামনে ও সামনের সড়কে অবস্থান নিতে শুরু করেন। ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে হাজারো শিক্ষার্থীর স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আজিমপুর মোড়। আন্দোলনকারীদের মুখে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে—
“জেগেছে রে জেগেছে, হোম ইকোনমিক্স জেগেছে!” “ক্যাম্পাসে পুলিশ কেন, জবাব চাই!” “আমার বোন আহত কেন, প্রশাসন জবাব দাও!”
সড়ক অবরোধ হলেও পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, নির্ধারিত চাকরি পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে যাতায়াত কিছুটা শিথিল রাখা হলেও কোনো অবস্থাতেই বিতর্কিত অধ্যক্ষকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছাকে পদত্যাগ করতে হবে। পদত্যাগের লিখিত বার্তা না পাওয়া পর্যন্ত কলেজের যাবতীয় ক্লাস, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও চূড়ান্ত পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
গভীর রাতে আবাসিক হলে ও ক্যাম্পাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে নির্যাতন এবং হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের দ্রুত বিচার করতে হবে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি জানাতে হবে।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও অসদাচরণের অভিযোগ এনে তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছাকে অবরুদ্ধ করেন।
টানা ১৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে অধ্যক্ষকে উদ্ধার করতে পুলিশ চত্বরে প্রবেশ করে। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশ উদ্ধার অভিযানের নামে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়।
ছাত্রীদের চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামানো হয় এবং এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ করা হয়।
পুলিশের বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে ও লাঠির আঘাতে বেশ কয়েকজন ছাত্রী মারাত্মক আহত হন। তাঁদের মধ্যে ৩ থেকে ৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, যার মধ্যে এক ছাত্রীর অবস্থা গুরুতর এবং তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) ভর্তি।
পুলিশ ছাত্রীদের আবাসিক হলেও প্রবেশ করে মারধর করে এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র কেড়ে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলার পরও দমে যাননি শিক্ষার্থীরা। রাত আড়াইটা পর্যন্ত তারা আজিমপুরের রাজপথে অবস্থান ধরে রাখেন এবং শুক্রবার সকাল থেকে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচিতে নামেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের একটি বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের সূচনা।
শিক্ষার্থীরা রাত ১২টা পর্যন্ত অনুমতির অনুরোধ জানালেও অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৫টা বেজে যায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছা আয়োজক দুই শিক্ষার্থীর হলের সিট বাতিল করেন। শিক্ষার্থীরা ক্ষমা চাইতে গেলে সিট ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক রাতের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবি করেন অধ্যক্ষ।
শিক্ষার্থীরা একে “চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক চরম স্বেচ্ছাচারিতা” আখ্যা দিয়ে আন্দোলনে নামেন। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই আন্দোলন রাজনৈতিক নয়—এটি নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার লড়াই।
নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যাপক মেহেরুন্নেছা বলেন, “শিক্ষার্থীরা রাত ১২টার কথা বলে ভোর ৫টা পর্যন্ত অডিটোরিয়াম ব্যবহার করেছে। আমি রাগের মাথায় সিট বাতিল করলেও পরে বিদ্যুৎ অপচয়ের বিল আদায়ের সিদ্ধান্ত নিই। তারা আমাকে সাদা কাগজে পদত্যাগে সই করতে বলছে, যা আমি কখনো করব না।”
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জামিল হোসেন জানান, শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির পক্ষে সড়কে অবস্থান করছেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আজিমপুর এলাকায় গাড়ি চলাচল ধীরগতি হলেও আন্দোলনকারীরা তাদের দাবিতে অনড়। ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটামের দিকেই এখন নজর সবার।

