জয়নাল আবেদীনঃ রংপুরে এক বেসরকারি কলেজ প্রভাষকের বিরুদ্ধে হজ এবং চাকরির প্রলোভনে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। প্রতারণার একাধিক মামলায় দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা ও দুই মাসেরও বেশি সময় জেলহাজতে বন্দি থাকার পরও ওই শিক্ষককে ‘শিক্ষা ছুটি’ দেখিয়ে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা (এমপিও) ছাড় করার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কলেজ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মীরবাগ ডিগ্রি কলেজে নজিরবিহীন এ জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম মোহাম্মদ আলী বাবু, যিনি কলেজটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবু শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘দিয়া ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি হজ এজেন্সির পরিচালনা পর্ষদের সাথে যুক্ত থেকে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। হজ পালনে সৌদি আরব পাঠানো এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নামে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন।
২০২৪ সালে ৭৫ জন হজযাত্রীর শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ঐ বছরের ২০ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাবুসহ তিনজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শেষভাগে নীলফামারীতে এক ভুক্তভোগীর মামলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করে। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল একটি আদালত প্রতারণা মামলায় তাঁকে ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং ৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন।
কারাদণ্ড ও জামিনে মুক্তির পর আবারও আত্মগোপনে চলে যান এই শিক্ষক। সবশেষ গত ১৫ মে মধ্যরাতে রংপুর মহানগরীর একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে বাবুর বিরুদ্ধে নীলফামারী থানায় ২টি এবং রংপুরের আদালতে ৩টি মামলা চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারের পরদিন, অর্থাৎ ১৬ মে তাকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বাবু ১৫ মে থেকে টানা জেলহাজতে বন্দি থাকলেও মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক হাজিরা খাতায় ১০ মে থেকেই তাঁর নামের পাশে ‘শিক্ষা ছুটি’ লিখে রাখা হয়। শুধু তা-ই নয়, মে ও জুন—এই দুই মাসের পুরো সরকারি এমপিও বেতন তুলে নেন তিনি। হাজিরা খাতার একটি অনুলিপি গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে।
কারাবন্দি শিক্ষকের এমপিও বেতন ছাড় এবং অনুমোদনহীন শিক্ষা ছুটি নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে।
কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি সেকেন্দার আলী বলেন, “মোহাম্মদ আলী বাবু শিক্ষা ছুটির আবেদন করেছিলেন এবং সেটির ওপর একটি রেজুলেশন হয়েছিল। তবে ছুটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন পায়নি। আগামী মিটিংয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিপত্রসহ কাগজপত্র উপস্থাপনের কথা রয়েছে।” তবে অনুমোদনের আগেই কারাবন্দি অবস্থায় তিনি কীভাবে দুই মাসের বেতন পেলেন—এমন প্রশ্নে সভাপতি মন্তব্য না করে তা অধ্যক্ষের ওপর ঠেলে দেন।
এ বিষয়ে মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো প্রকার সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে নিজ ক্ষমতাবলে তিনি ঐ শিক্ষকের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছেন বলে দাবি করেন।
কারাবন্দি আসামিকে ভূয়া ‘শিক্ষা ছুটি’ দেখিয়ে সরকারি অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রংপুর অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর মো. গোলাম মাজেদ তীব্র বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, “কারাবাস এবং শিক্ষা ছুটি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। শিক্ষা ছুটি মঞ্জুরের একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। হাজতে থাকা কোনো শিক্ষককে শিক্ষা ছুটি দেখিয়ে বেতন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমার জানা ছিল না, তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে দ্রুতই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

