কলাপাড়া প্রতিবেদক: পটুয়াখালীর সাগরকন্যা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্ভিস বক্সটি সাগরের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মেরিন ড্রাইভের সানসেট পয়েন্টসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। এতে সাগররক্ষা বাঁধ ও নবনির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়কও হুমকির মুখে পড়েছে। কুয়াকাটায় ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তখন জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মেরিন ড্রাইভসহ বেড়িবাঁধ হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
সরেজমিনে জানাজায়, মঙ্গলবার উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্ভিস বক্সটি সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়। এ ছাড়া মেরিন ড্রাইভের সানসেট পয়েন্টেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিমে লেম্বুর বন পর্যন্ত সাগররক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক দেবে গেছে ও স্থানচ্যুত হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)পক্ষ থেকে কিছু এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যে কোনো সময় সাগররক্ষা বাঁধ ভেঙে কুয়াকাটার লোকালয়ে লোনা পানি ঢুকে পড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই কুয়াকাটা সৈকতে তীব্র ভাঙন চলছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উত্তাল ঢেউয়ে সৈকত ক্রমেই লোকালয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি ভাঙন প্রতিরোধে আন্দোলনও করে আসছেন স্থানীয়রা।ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে তিনটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছিলো। তবে বিভিন্ন কারণে সেগুলো অনুমোদন পায়নি। সর্বশেষ গত বছর ৭৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয় পাউবো। সেটিও এখনো অনুমোদন না পাওয়ায় ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে জিরো পয়েন্টের পশ্চিম প্রান্তে সাগরের বড় বড় ঢেউ সরাসরি বেড়িবাঁধে আছড়ে পড়ছে। এতে বাঁধের সামনে থাকা সিসি ব্লকগুলো নড়বড়ে হয়ে স্থানচ্যুত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বাঁধের স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জহিরুল ইসলাম মিরন বলেন,জিরো পয়েন্টে বর্তমানে যেখানে বেড়িবাঁধ, সেখানে একসময় সমুদ্র ছিলো অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরে। ভাটার সময় দীর্ঘ সৈকত পেরিয়ে সাগরে নামতে হতো পর্যটকদের। গত ৩০ থেকে ৩৫ বছরে সেই দেড় কিলোমিটার সৈকত সাগরে বিলীন হয়ে এখন সমুদ্র বেড়িবাঁধের কাছে এসে ঠেকেছে।’
কুয়াকাটা উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির সদস্য মো ফারুক মীর বলেন,দেড় কিলোমিটার বিস্তৃত সৈকত ছাড়াও একসময় বেড়িবাঁধের সামনে সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য স্থাপনা ছিল। কয়েক বর্গকিলোমিটারজুড়ে ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান, এলজিইডির বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট কাম রেস্ট হাউজ, ইকোপার্ক,ঝাউবন,সাগরঘেঁষা সড়ক,হোটেল-মোটেলসহ অনেক স্থাপনাই এখন বিলীন বা হুমকির মুখে। সর্বশেষ ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সটিও সাগরে চলে গেছে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন,গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে কুয়াকাটা দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে চার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু সাগরভাঙনের কারণে এখন পুরো পর্যটনশিল্পই হুমকির মুখে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগের পাশাপাশি দফায় দফায় চিঠি দিয়েছি। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করা না গেলে কুয়াকাটার পর্যটনশিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।’
কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, ‘কুয়াকাটায় ভাঙন প্রতিরোধের জন্য একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় বেশি হওয়ায় হয়তো অনুমোদন পেতে বিলম্ব হচ্ছে। তাই কম ব্যয়সাপেক্ষ একটি বিকল্প প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রস্তাবনাটি তৈরি হলে তা সরকারের কাছে দাখিল করা হবে। ধাপে ধাপে এ প্রকল্পের মাধ্যমে সাগরভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ-সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন,প্রাথমিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প অনুমোদনের কাজ চলছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই কুয়াকাটায় সাগরভাঙন রোধে স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
