শর্শা প্রতিবেদক: যশোরের শার্শার দক্ষিণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাদকের করাল গ্রাসে ধ্বংসের মুখে পড়েছে স্থানীয় যুবসমাজ। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও থানা পুলিশের নিয়মিত অভিযান ও তৎপরতা সত্ত্বেও কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না সীমান্তপাড়ের এই অবৈধ কারবার। ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় সিরাপ উইনিক্স, কোরেক্স, ফেনসিডিল এবং ইয়াবা উদ্ধার হলেও এবং বেশ কয়েকজন আটক হলেও মূল সিন্ডিকেট রয় গেছে অধরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর রুদ্রপুর সীমান্ত থেকে ৫০ বোতল ফেনসিডিলসহ মনিরুল ইসলামকে আটক করে খুলনা ২১ বিজিবি এবং একই দিনে আরও ৫৫০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। এর পরদিনগুলোতেও অভিযান অব্যাহত ছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর বামুনিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেনকে ১৫ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে বাগআঁচড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র। ২৪ সেপ্টেম্বর শার্শা থানা পুলিশ গাতিপাড়া গ্রামের সেলিম হোসেনকে ১২ পিস ইয়াবাসহ এবং রঘুনাথপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামকে ১ কেজি গাঁজাসহ আটক করে।
২৬ সেপ্টেম্বর রুদ্রপুর গ্রাম থেকে ২০ বোতল উইনিক্স সিরাপসহ সাইদুর রহমানকে আটক করে বিজিবি। একই দিনে গোগা কলেজ মোড় থেকে ৫০ পিস ইয়াবাসহ সাতক্ষীরার আজিজুলকে পুলিশ এবং অগ্রভুলোট গ্রামের আনিছুর রহমানকে ১০ পিস ইয়াবাসহ আটক করে যশোর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে গোগা গাজী পাড়ার রওশন আলীকে ৭৫ বোতল উইনিক্স সিরাপসহ আটক করে ২১ বিজিবির সদস্যরা।
তবে নিয়মিত আসামি ধরা পড়লেও মাদক কারবারের মূল রাঘববোয়ালরা সব সময়ই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয়দের মতে, বিজিবি ও পুলিশের হাতে যারা আটক হচ্ছে, তারা মূলত দৈনিক মজুরিভিত্তিক লেবার বা চুনোপুঁটি কারবারি। গ্রামের অলিগলিতে ছোট ছোট ব্যবসায়ী দিয়ে মূল সিন্ডিকেট তাদের এই ব্যবসা পরিচালনা করছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যেসব প্রভাবশালী চক্র বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদকের রমরমা বাণিজ্য চালিয়েছে, তারা এখনো বহাল তবিয়তে সক্রিয় রয়েছে। প্রতিনিয়ত অভিযান চলার পরও তাদের এই বেচাকেনা কীভাবে নির্বিঘ্নে চলছে এবং বর্তমানে কারা তাদের পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শার্শার একেবারে সীমান্তঘেঁষা রুদ্রপুর ও দাদখালি গ্রাম বর্তমানে মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবা বিক্রির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া গোগা গাজী পাড়া, কোটার মোড়, বাগুড়ী বেলতলা, সাত মাইল, বসতপুর, জামতলা, টেংরা, গোগা কলেজ মোড়, হরিশ্চন্দ্রপুর, কালিয়ানী, অগ্রভুলোট, পুটখালী বারোপোতা, দৌলতপুর, সাদীপুর, রঘুনাথপুর এবং বেনাপোলের বিভিন্ন অলিগলিতে প্রতিনিয়ত দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় মাদক।
শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সামিনুল হক জানান, এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে পুলিশ অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।
অন্যদিকে খুলনা ব্যাটালিয়ন (২১ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাফিজ ইমতিয়াজ আহসান জানিয়েছেন, সীমান্তে সব ধরনের চোরাচালান ও মাদক পাচার রোধে দীর্ঘদিন ধরে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল তৎপরতা জোরদার রাখা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন সীমান্তজুড়ে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং মাদকের চালান জব্দ করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল খুচরা বহনকারীদের আটক করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মূল মদদদাতা ও সিন্ডিকেটের রাঘববোয়ালদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে শার্শার সীমান্ত এলাকাকে মাদকমুক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

