বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যুতা, সশস্ত্র হামলা ও লুটপাটের ঘটনা। গত তিন দিনে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মানিকদী ও আশুলিয়ায় অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের তাণ্ডবের খবর পাওয়া গেছে। প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যেই উঠে এসেছে রাজনৈতিক পেশিশক্তি ব্যবহার করে ‘টাকার বিনিময়ে চুক্তিতে’ জমি ও স্থাপনা দখলের ভয়ঙ্কর চিত্র। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে ১৫০ থেকে ২০০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়। তারা ৩৫ কাঠার একটি প্লটের বেষ্টনী ভেঙে ভেতরে ঢুকে কার্যালয় ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনায় মো. লিমন ও মো. মনোয়ার হোসেন সাদ্দাম নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন, নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থের বিনিময়ে চুক্তির ভিত্তিতে তারা বিভিন্ন স্থানে জমি দখল ও ছিনতাইয়ের কাজ করে থাকেন।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে মিরপুর ১ নম্বরের ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি’ কেন্দ্রে। ১৯৭৪ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত হাজার হাজার নারী ও শিশুকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসা এ প্রতিষ্ঠানটিতে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ২০০-২৫০ জন দুর্বৃত্ত হামলা চালায়। ওষুধ ও টিকাসহ মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করার পর বুলডোজার ও এক্সকাভেটর দিয়ে পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত সংক্রান্ত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়ে লুটপাট চালিয়েছে। পেছনে ছিল একটাই শক্তি, রাজনৈতিক পেশিশক্তি। উদ্দেশ্যও একটাই, জমি দখল।”
এ ঘটনায় শাহ আলী থানার তৎকালীন ওসি জাহাঙ্গীর আলমের সামনেই স্থাপনাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও পুলিশ কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনায় ঢাকা উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়াসহ ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আদাবর: শ্যামলী হাউজিংয়ে ব্যবসায়ী আমিনুর রহমানের আটতলা ভবনে শনিবার রামদা, চাপাতি ও পিস্তল নিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ভুক্তভোগীদের দাবি, আদালতের রায়ে দখলমুক্ত করা ভবনটি আবার দখলে নিতে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল।
মানিকদী (ইসিবি চত্বর): নিউ গিনি প্রপার্টিজের একটি প্রকল্পে ২০০-২৫০ জনের সশস্ত্র দল ফাঁকা গুলি ছুড়ে হামলা চালায়। তারা নির্মাণশ্রমিকদের মারধর করে প্রায় তিন কোটি টাকার মালামাল ও ১৬টি মোবাইল লুট করে। এ ঘটনায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পুলিশ এ ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ারসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
আশুলিয়া (সাভার): শ্রীপুরের তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাজিল মাদ্রাসা ও আশিয়া আশরাফ মহিলা মাদ্রাসায় অর্ধশতাধিক অস্ত্রধারী তাণ্ডব চালিয়ে লকার ভেঙে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লুট করে। পরিচালনা পর্ষদের সম্পত্তি দখলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা যৌথভাবে এ হামলা চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আদাবর ও মোহাম্মদপুরের ঘটনায় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা সত্ত্বেও পুলিশ ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
পুলিশের ভূমিকার বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) আকতার হোসেন বলেন, “রাড্ডার ঘটনায় কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের বিলম্ব বা গাফিলতির বিষয়ে মৌখিকভাবে ও ফরমাল কমিটি গঠন—উভয়ভাবেই তদন্ত করা হয়। প্রতিটি অভিযোগই গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন-নর্থ) মো. মাহিদুল ইসলাম জানান, মানিকদীর ঘটনাটি জমি ও রাস্তা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এবং বিস্তারিত তদন্ত চলছে। পাঁচ ঘটনার প্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত মোট ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অসহায় মা-শিশুদের দাতব্য প্রতিষ্ঠানে হামলা ও দেশজুড়ে অব্যাহত দখলবাজির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই বাস টার্মিনাল, হাটবাজার, বালুমহাল ও ইন্টারনেট ব্যবসাসহ নানা খাত নিয়ন্ত্রণে একশ্রেণির নেতাকর্মীর বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চলছে। দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায় টিআইবি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাবের আহমেদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর একধরনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিলে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরা সব সরকারের আমলেই সুবিধা নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে তা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা উচিত, যাতে অপরাধীরা বার্তা পায়।”

