কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ কুড়িগ্রামের চিলমারীতে চিকিৎসকদের চরম দায়িত্বহীনতা ও মারাত্মক অবহেলার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত এক হতদরিদ্র দিনমজুরের বাম হাতের গভীর ক্ষতের ভেতরে কাচের টুকরো রেখেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। এর ফলে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা ও মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন ওই ভুক্তভোগী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী সাইদার মিয়া অত্যন্ত অসহায়, ভূমিহীন ও দরিদ্র মানুষ। তিনি চিলমারী উপজেলার মজিদের পাড় এলাকায় অন্যের জমিতে ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন।
মাসিক দেড় মাস আগের এক দিনে দুর্ঘটনাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ঘরের ভেতরে মাটিতে পড়ে যান সাইদার। এ সময় ঘরের ভাঙা কাচের ওপর হাত পড়ে তার বাম হাতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং হাতের ভেতরে ঢুকে যায় ধারালো কাচের দুটি টুকরো।
রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় স্বজনরা তাকে দ্রুত চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে শয্যা বা স্থান খালি নেই অজুহাত দেখিয়ে তাকে ভর্তি করা হয়নি। এমনকি চিকিৎসকরা কোনো ধরনের গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা এক্স-রে না করেই দায়সারাভাবে ক্ষতস্থানে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ ও সাময়িক চিকিৎসা দিয়ে হাতের ভেতরে কাচ রেখেই তাকে বাড়িতে ফেরত পাঠান।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর থেকেই সাইদারের হাতের ক্ষতস্থানটিতে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। হাতের ভেতরে কাচ রয়ে যাওয়ায় তিনি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হাত নাড়াতে পারেননি এবং চরম যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজন তাকে বাইরে নিয়ে এক্স-রে করান। এক্স-রে রিপোর্টের মাধ্যমেই মূলত হাতের ভেতরে ধারালো কাচের দুটি টুকরো লুকিয়ে থাকার ভয়াবহ বিষয়টি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে অন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করে তার হাত থেকে কাচের টুকরোগুলো সফলভাবে বের করা হয়।
ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ভুক্তভোগী সাইদার মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়ে যাওয়ার পর ঘরের গ্লাসে হাতে আঘাত পাই। স্থানীয়রা দ্রুত আমাকে চিলমারী হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে সামান্য চিকিৎসা দিয়ে হাতের ভেতরে কাচ রেখেই আমাকে ফেরত পাঠানো হয়। সুস্থ না হওয়ায় এক মাস পর এক্স-রে করিয়ে কাচের টুকরো ধরা পড়ে, পরে অপারেশন করতে হয়েছে।”
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা হাসপাতালে কি মানুষের চিকিৎসা হয়, নাকি মেরে ফেলা হয়? এখানে গরিব রোগীদের অবহেলা করা হয়। এ ঘটনার সম্পূর্ণ দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
চিলমারী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম সাদ্দাম এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সাইদার মিয়া অত্যন্ত গরিব মানুষ। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা একটু মানবিক আচরণ করলেই এবং দায়িত্ব নিয়ে ক্ষত পরিষ্কার ও এক্স-রে করালেই তাকে এক মাস ধরে এমন পৈশাচিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো না। হাসপাতালের এহেন অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা একপ্রকার স্বীকার করে বলেন, “এটা ভুলবশত হয়ে গেছে। এজন্য সরি। রোগীকে বলেন চিকিৎসা করাতে। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।”
চিকিৎসকদের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন ভুল ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যমূলক মন্তব্যে স্থানীয় সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী এ ধরনের চিকিৎসা ত্রুটির বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

