উভয়সংকটে ট্রাম্প: ইরান যুদ্ধের ষষ্ঠ মাসে ট্রাপড যুক্তরাষ্ট্র, সামনে কোন পথ?

0
উভয়সংকটে ট্রাম্প: ইরান যুদ্ধের ষষ্ঠ মাসে ট্রাপড যুক্তরাষ্ট্র, সামনে কোন পথ?

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ষষ্ঠ মাসে পা দেওয়ায় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। যুদ্ধ শুরুর সময় যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখন দীর্ঘায়িত হয়ে অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। একদিকে মার্কিন সামরিক গুদামে ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট, অন্যদিকে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের সামনে এখন বেছে নেওয়ার মতো সহজ কোনো সমাধান নেই।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও শীর্ষস্থানীয় সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের সামনে এখন মূলত তিনটি ‘খারাপ বিকল্পের মেনু’ খোলা আছে, ওমানের মধ্যস্থতায় তৈরি হওয়া প্রস্তাব মেনে নিয়ে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের কিছুমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি স্বীকার করে নেওয়া। এতে যুদ্ধ থামলেও যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল কূটনৈতিক ছাড় দিতে হবে। যুদ্ধ তীব্র করে সামরিক চাপ বাড়ানো। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আরও আকাশচুম্বী হবে। ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি রাখা এবং বিচ্ছিন্ন হামলার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু এতে যুদ্ধ শেষ করার কোনো সম্মানজনক পথ তৈরি হবে না।

বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কৌশলগতভাবে এই জলপথে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তেহরান ও মাসকাটের (ওমান) মধ্যে চলমান সম্ভাব্য চুক্তিতে এই প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা হলেও তা যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে কি না তা এখনও অস্পষ্ট।

যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবস্থান নিয়েছেন যে, হরমুজ কোনোভাবেই ইরানের একক নিয়ন্ত্রণে যেতে পারবে না এবং এটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবেই রাখতে হবে, কিন্তু ট্রাম্পের আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের ইতিহাসে বিশ্লেষকদের ধারণা—তিনি শেষ পর্যন্ত ভিন্ন অবস্থান নিতে পারেন।

সম্প্রতি ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত সামরিক বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগনের সাথে ট্রাম্পের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসেই যুক্তরাষ্ট্র ১,০০০-এর বেশি প্যাট্রিয়ট ও থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৮৫০-এর বেশি টমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে ফেলেছে, যার ফলে মার্কিন অস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব মিত্র দেশগুলোর সামরিক চাপ কমানোর অনুরোধ, আর অন্যদিকে মার্কিন সমরাস্ত্রের স্বল্পতা—এ দুটি কারণেই ট্রাম্প আপাতত ইরানে বিশাল পরিসরের হামলা চালানো স্থগিত রেখেছেন।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি কঠোর লড়াই করছে। ইতিমধ্যে সেপ্টেম্বর থেকেই কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটাভুটি শুরু হয়ে যাবে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মার্কিন জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সংকট পেট্রোলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সরাসরি মার্কিন ভোটারদের পকেটে প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল বিদেশমুখী যুদ্ধ এড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতে মনোযোগ দেওয়া, অথচ বর্তমানে দীর্ঘায়িত ইরান যুদ্ধ তার এই ভাবমূর্তির বিপরীত চিত্র তৈরি করেছে।

সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফের মতে, ইরান যুদ্ধের এই জটিল পরিস্থিতিকে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আধুনিক যুদ্ধে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কতটুকু এবং আমেরিকানদের সহনশীলতার সীমা কোথায়, তারা মূলত এই যুদ্ধ থেকে সেই পাঠ নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, দ্রুত কোনো চুক্তি না হলে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অবস্থানে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।