আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অন্তত ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার প্রাণহানি এবং ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক ব্যয় শেষে অবশেষে ইরাক থেকে সব শেষ ঘাঁটি গুটিয়ে নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাইডেন প্রশাসনের গৃহীত সেনা প্রত্যাহারের নীতিটি ট্রাম্প প্রশাসন বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের (বুধবার) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঐতিহাসিক প্রস্থানকে নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ‘বিশাল বিজয়’ হিসেবে দেখছে ইরান ও দেশটির সমর্থনপুষ্ট আঞ্চলিক শিয়াপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এতে করে ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক বিশাল শূণ্যতা তৈরি হবে, যা একদিকে তেহরানের প্রভাব একচ্ছত্র করবে এবং অন্যদিকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সুপ্ত বা ঘুমন্ত সেলগুলোকে (sleeper cells) পুনর্গঠিত হতে সহায়তা করবে।
২০০৩ সালে সুন্নি স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে শিয়াপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের টানাপোড়েনের সুযোগে বাগদাদের রাজনৈতিক ও সামরিক চালিকাশক্তিতে তেহরান তাদের অবস্থান শক্ত করে।
ইরান সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর শীর্ষ কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন বিদায়কে ‘ইরাকি প্রতিরোধ সংগ্রামের ঐতিহাসিক জয় এবং আমেরিকান ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্পের চরম পরাজয়’ বলে অভিহিত করেছেন। একইভাবে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম একে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, মার্কিন উপস্থিতিই ছিল এই অঞ্চলের মূল অস্থিরতার কারণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে জানান, ইরাকে এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ইরানের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য (balance of power) ধরে রেখেছিল। মার্কিন সেনারা চলে যাওয়ায় এখন থেকে ইরাকের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তেহরান সম্পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
মার্কিন বাহিনীর বিদায়ের পরপরই ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করছেন স্থানীয় গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারা। একসময়ের মার্কিনবিরোধী ঘাঁটি ফালুজার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাইসহ অনেক সাধারণ ইরাকি পূর্ণ সার্বভৌমত্বকে স্বাগত জানালেও দেশটির বর্তমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বিদায় থেকে সবচেয়ে বড় সুবিধা নিতে পারে কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি সতর্ক করেছেন যে, মার্কিন বাহিনীর উচ্চপ্রযুক্তির গোয়েন্দা তথ্য (intelligence), লজিস্টিক সাপোর্ট এবং ড্রোন নজরদারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আইএসের গোপন নেটওয়ার্কগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
কৌশলগত তেলনগরী কিরকুকের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতি জানান, বিগত কয়েক সপ্তাহে আইএসের ঘুমন্ত সেলগুলোর তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি চারজন সেনা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন প্রত্যাহারের দিনকে কেন্দ্র করে একটি বড় ধরনের আত্মঘাতী হামলার ছক ভেস্তে দিয়েছে ইরাকি বাহিনী, যা স্পষ্ট করে যে নিরাপত্তার এই শূন্যতাকে কাজে লাগাতে আইএস কতটা তৎপর।
২০১১ সালে প্রথম দফায় মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৪ সালে আইএসের আগ্রাসন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে পুনরায় ইরাকে প্রবেশ করে মার্কিন বাহিনী। আফগানিস্তানের যুদ্ধের চেয়ে ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এ দ্বিগুণ আমেরিকান সেনা নিহত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ যুদ্ধে ইরাকের মাটিতে থাকা মার্কিন সেনারা বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছেন, যা চলতি বছর ১৮ জন মার্কিন সেনার প্রাণহানির কারণ হয়।
বাগদাদ সরকার বর্তমানে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের চূড়ান্ত বিদায়ের পর ইরাক কি তার নিজস্ব নিরাপত্তার লাগাম শক্ত হাতে ধরতে পারবে, নাকি ইরান ও আইএসের দ্বিমুখী চাপে নতুন কোনো সংকটে নিপতিত হবে—তা এখন বৈশ্বিক রাজনীতির দেখার বিষয়।

