যশোর জেলা মডেল মসজিদে আমের ‘অস্বাভাবিক’ মুকুল অলৌকিক না কি এম্যালফরমেশন’ রোগ !

0
যশোর জেলা মডেল মসজিদে আমের ‘অস্বাভাবিক’ মুকুল অলৌকিক না কি এম্যালফরমেশন’ রোগ !

যশোর প্রতিনিধি: যশোর জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি আম গাছের মুকুলে ব্যাপক অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সাধারণ আমের মুকুল যেখানে লম্বা ও ঝুরঝুরে হয়, সেখানে এই গাছের মুকুলগুলো অত্যন্ত ঘন, স্তপীকৃত এবং অনেকটা ফুলকপির মতো পিণ্ড আকারে আটকে আছে। এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মুসল্লি ও উৎসুক জনতার মধ্যে কৌতূহল ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও জনমুখে একে ঘিরে নানা অলৌকিক বা দৈব ব্যাখ্যা প্রচার হতে দেখা যাচ্ছে। তবে কৃষিবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো অলৌকিক বিষয় নয় বরং এটি আম গাছের একটি পরিচিত রোগ, যাকে বলা হয় ‘ম্যাঙ্গো ম্যালফরমেশন’ (MANGO MALFORMATION) বা আমের মুকুল বিকৃতি রোগ। এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন যশোর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জনাব বিল্লাল বিন কাশেম বলেন, ‘মসজিদ প্রাঙ্গণে আমের মুকুলের এই ভিন্নতর রূপ দেখে অনেক মুসল্লি ও সাধারণ মানুষ ভিড় করছেন। বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক, তবে একে অলৌকিক কিছু ভেবে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। ইসলাম সবসময় জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চর্চাকে উৎসাহিত করে।

প্রকৃতিতে আল্লাহ তাআলার প্রতিটি সৃষ্টিই সুশৃঙ্খল নিয়মে চলে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে এটি গাছের একটি রোগজনিত বিকৃতি। তাই সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, একে অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে গণ্য না করে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার জন্য। সাধারণত আমের মুকুল মঞ্জরি দণ্ডের চারপাশ জুড়ে সুবিন্যস্ত থাকে। কিন্তু ম্যালফরমেশনে আক্রান্ত হলে মুকুলগুলোর ডালপালা ছোট হয়ে যায় এবং ফুলগুলো গাদাগাদি করে একটি পিণ্ডের মতো তৈরি করে। আক্রান্ত মুকুলগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত ও সবুজ হয় এবং অনেক দিন ধরে গাছে ঝুলে থাকে। এসব মুকুলে কোনো ফল ধরে না।

বিজ্ঞানের ভাষায় এটি মূলত এক প্রকার হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা এবং ছত্রাকের আক্রমণের সম্মিলিত ফল। কেন এমন হয় ? উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এই রোগের মূল কারণ হলো ‘ফিউজারিয়াম মোনিলিফর্মি’ নামক এক ধরনের ছত্রাক। এছাড়া অতিরিক্ত কুয়াশা, তীব্র শীত বা হরমোনের অস্বাভাবিক নিঃসরণও এর পেছনে দায়ী হতে পারে। অনেক সময় এক ধরনের ক্ষুদ্র মাকড় (গওঞঊ) এই ছত্রাক ছড়াতে সাহায্য করে। যখন গাছের অভ্যন্তরীণ হরমোন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়, তখন মুকুলগুলো স্বাভাবিক বৃদ্ধি না পেয়ে এভাবে জট পাকিয়ে যায়। জনমনে বিভ্রান্তি ও সচেতনতা: মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এ ধরনের দৃশ্য দেখে অনেকেই একে ‘অলৌকিক নিদর্শন’ হিসেবে গণ্য করছেন। জনসমাগম বেড়ে যাওয়ায় ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। অথচ এটি কেবল একটি উদ্ভিদতাত্ত্বিক সমস্যা। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানেই মহান স্রষ্টার শৃঙ্খলা বিদ্যমান, তবে কোনো রোগ বা জৈবিক বিকৃতিকে অলৌকিকতা বলে চালিয়ে দেওয়া অজ্ঞতার নামান্তর।

কৃষি প্রধান এই অঞ্চলে এ ধরনের রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি। কারণ, একটি গাছ থেকে এটি ধীরে ধীরে পুরো বাগানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যশোরের মডেল মসজিদে দৃশ্যমান এই ‘অস্বাভাবিক’ মুকুল মূলত প্রকৃতির একটি অসুস্থ রূপ। একে কেন্দ্র করে কোনো গুজব বা অন্ধবিশ্বাসে কান না দিয়ে আমাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা উচিত। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উচিত এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং জনগণকে সচেতন করা, যাতে করে এই

ছত্রাকবাহিত রোগ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য আম গাছে ছড়িয়ে না পড়ে। বিজ্ঞানের সঠিক প্রচারই পারে সুস্থ কৃষি পরিবেশ এবং যৌক্তিক সমাজ গঠন করতে। জেলা মডেল মসজিদের আমগাছে অস্বাভাবিক এই মুকুল সাধারণ মুসল্লি ও উৎসুক জনতার মধ্যে কৌতূহল ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।