সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর: দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প ও ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ চালুর প্রক্রিয়াধীন

0
সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর: দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প ও 'ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন' চালুর প্রক্রিয়াধীন

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, দক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিদেশী নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামগ্রী উৎপাদনের লক্ষ্যে ‘দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প’ গড়ে তুলতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে সাভার সেনানিবাসে ৯ম পদাতিক ডিভিশন আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে সম্মানজনক ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ (জাতীয় পতাকা) প্রদানকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আধুনিক যুদ্ধের কৌশল ও ভূ-রাজনীতি তুলে ধরে বলেন, প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম হলেও মানুষই মূল শক্তি।

বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্র কেবল স্থল, সমুদ্র বা আকাশেই সীমাবদ্ধ নয়; সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী যেন যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে একত্রে ও সমন্বিতভাবে (Joint Warfare Capability) কাজ করতে পারে, সে ধরনের সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো জোরদার করা হচ্ছে।

সশস্ত্র বাহিনীর ত্যাগ ও সার্বিক অবদানকে মূল্যায়ন করে সরকার জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে একগুচ্ছ নতুন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে, জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০% থেকে বাড়িয়ে ১৩৮% পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ নীতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন, আবাসন, উন্নত চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ আগের চেয়ে আরও আধুনিক ও সুসংহত করা হচ্ছে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার নানা অপচেষ্টা হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং সেনাবাহিনীর ইতিহাস একে অপরের পরিপূরক।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান প্রথম ‘উই রিভোল্ট’ (আমরা বিদ্রোহ করলাম) বলে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিজস্ব লেখা নিবন্ধ ‘একটি জাতির জন্ম’ (যা ১৯৭২ সালের দৈনিক বাংলা, ১৯৭৪ সালের সাপ্তাহিক বিচিত্রা এবং ১৯৮০ সালের দৈনিক দেশে প্রকাশিত) থেকে উদ্ধৃত করেন:

“সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও, আর জওয়ানদের ডাকলাম… সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে… তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট, ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সাল।”

তিনি উল্লেখ করেন, তৎকালীন সময়ে ১, ২, ৩, ৪ এবং ৮ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অকুতোভয় বাংলাভাষী সেনাসদস্যরা এই সশস্ত্র প্রতিরোধ সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বিশ্ববাসীকে স্বাধীনতার বার্তা জানিয়ে বীরোচিত ভূমিকা রাখা হয়, যা আজও সশস্ত্র বাহিনীর অনুপ্রেরণার উৎস।

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, কেবল সার্বভৌমত্ব রক্ষাই নয়, দেশের যেকোনো জাতীয় সংকট—যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা সামাজিক পুনর্বাসনে সশস্ত্র বাহিনী সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা উজ্জ্বল করে চলেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী।