বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ ভূমিকম্প ঝুঁকি এড়াতে এবং কর্মপরিবেশ আরও আধুনিক ও সম্প্রসারণ করতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সচিবালয়। রবিবার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসংক্রান্ত প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন এই সচিবালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যাশনাল ক্যাপিটাল কমপ্লেক্সের মূল স্থপতি লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যানকে প্রাধান্য দিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী স্থাপত্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে এর প্রাথমিক ও ধারণাগত স্থাপত্য নকশা তৈরি সম্পন্ন করেছে।
এক নজরে নতুন সচিবালয় প্রকল্প:
নির্ধারিত স্থান: শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠ। জমির পরিমাণ: ৩১.৫৮ একর (বর্তমান সচিবালয়ের চেয়ে যা প্রায় দ্বিগুণ)। অবকাঠামো: ৩টি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন। অফিস স্পেস: ৩৩.১৬ লাখ বর্গফুট (বর্তমান অফিস স্পেসের চেয়ে প্রায় ১৪.৪ লাখ বর্গফুট বেশি)। পার্কিং সুবিধা: মোট ৩,৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। যার মধ্যে ৩,৬০০টি ভূগর্ভস্থ (বেজমেন্ট) এবং ২০০টি ভূ-উপরিস্থ। অন্যান্য সুবিধা: মসজিদ, ৩৫০ আসনবিশিষ্ট ২টি বহুমুখী (মাল্টিপারপাস) হল, সুপরিসর ক্যাফেটেরিয়া ও আধুনিক ডাকঘর। পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা: মোট অবকাঠামো এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখা হয়েছে।
বর্তমানে আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয়টি ১৭.৫৭ একর জমিতে বিস্তৃত। সেখানকার ১৩টি ভবনের মধ্যে ৮টি ভবনই স্বাধীনতার আগে তৈরি। বিশেষ করে ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবনগুলো ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবনটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পর্যালোচনায় যে প্রধান কারণগুলো উঠে এসেছে তা হল ঢাকা উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। অথচ শতবর্ষী ও পুরোনো ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল (Earthquake-resistant) প্রযুক্তি দিয়ে নির্মাণ করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুর জন্য এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে সচিবালয়ে ১৮.৭৬ লাখ বর্গফুট ব্যবহারযোগ্য জায়গা রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সচিবালয় কমপাউন্ডের বাইরে থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নতুন চাহিদার কারণে আরও অন্তত ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি স্পেস প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকায় এবং পর্যাপ্ত শৌচাগার ব্লক না থাকায় দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
লুই আই কানের করা ঢাকার শেরেবাংলা নগরের মূল মাস্টারপ্ল্যানেই গণভবন, সংসদ ভবন এবং জাতীয় সচিবালয়কে এক ছাতার নিচে রাখার পরিকল্পনা ছিল। নতুন এই উদ্যোগের ফলে লুই কানের মূল নকশা বাস্তবরূপ পেতে যাচ্ছে।
শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরিত হলে একদিকে যেমন কর্মকর্তাদের জন্য সর্বাধুনিক, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নতুন বহুতল ভবনগুলোতে অতিরিক্ত স্থান তৈরি হওয়ায় সচিবালয়ের বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এক আঙিনায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
নতুন এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়নে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।

