আইসিসির ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও ভারতের প্রভাব বিস্তার: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের মহাপ্রস্থান

0
আইসিসির ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও ভারতের প্রভাব বিস্তার: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের মহাপ্রস্থান

ক্রীড়া ডেস্কঃ ক্রিকেট বিশ্বের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিমুখী আচরণের চরম মূল্য দিতে হলো বাংলাদেশকে। নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে ভারত সফরে বিসিবির অনড় অবস্থানের প্রেক্ষাপটে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছে আইসিসি। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে আইসিসি এই চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ক্রিকেটে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিখ্যাত ক্রিকেট সাময়িকী উইজডেন আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে— ক্রিকেটের আইন কি দেশভেদে আলাদা?

সংকটের মূলে মোস্তাফিজ ও ‘রাজনৈতিক’ বার্তা

ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ জানুয়ারি। আইপিএলের মাঝপথে হঠাৎ করেই বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বিসিসিআই। এর নেপথ্যে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির কথা শোনা গেলেও ভারতের ক্রিকেট বোর্ড কেবল ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’ শব্দটি ব্যবহার করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশ এই ঘটনাকে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। বিসিবির দাবি ছিল— যদি একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের নিরাপত্তা দিতে স্বাগতিক দেশ ব্যর্থ হয়, তবে পুরো দলের সেখানে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ। খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সমর্থকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিসিবি ভারতকে এড়িয়ে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দেয়।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বনাম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: দুই নীতি

উইজডেনের প্রতিবেদনে আইসিসির বৈষম্যমূলক আচরণের চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সময় ভারত পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানালে আইসিসি তাদের জন্য ‘হাইব্রিড মডেল’ তৈরি করে। ভারতের সব ম্যাচ দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ভ্রমণ ক্লান্তিহীন সেই টুর্নামেন্টে ভারতই শিরোপা জয় করে।

অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইসিসি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। জয় শাহর নেতৃত্বাধীন আইসিসি বাংলাদেশের দাবির প্রতি বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে সাফ জানিয়ে দেয়— খেলা ভারতেই হবে। উইজডেন প্রশ্ন তুলেছে, ভারত তিন মাস আগে দাবি জানালে সেটি বৈধ হয়, কিন্তু সূচি ঘোষণার পর বাংলাদেশ কেন নিজেদের সুরক্ষায় কথা বলতে পারবে না?

অর্থনৈতিক পেশিশক্তির কাছে বন্দি ক্রিকেটঃ

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ভারত তাদের বিশাল বাজার এবং সুপারস্টারদের পুঁজি করে আইসিসিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আইসিসি জানে ভারত ছাড়া কোনো টুর্নামেন্ট মানেই বিশাল আর্থিক লোকসান। তাই ভারতের সব ‘আবদার’ আইসিসি মেনে নিলেও বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবার আর মাথা নত না করে খেলোয়াড়দের সুরক্ষা এবং আত্মসম্মানকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিসিবির এই কঠোর অবস্থানের কারণে আইসিসি বিকল্প হিসেবে স্কটল্যান্ডকে বেছে নিতে বাধ্য হয়।

উইজডেনের কড়া সমালোচনাঃ

উইজডেনের মতে, বিসিসিআই মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছিল। ক্রিকেটকে এখানে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়: “বাংলাদেশ তাদের খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় দাঁড়িয়েছে, যা নীতির প্রশ্নে অটল থাকার উদাহরণ। কিন্তু আইসিসি প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব ক্রিকেটে ন্যায্যতা আসলে শর্তসাপেক্ষ এবং এটি দেশভেদে পরিবর্তিত হয়।”

বিশ্বকাপ বিসর্জন, কিন্তু নৈতিক জয়ঃ

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ধাক্কা হলেও, নৈতিকভাবে বিসিবি জয়ী হয়েছে। ভারত এবং আইসিসির এই একতরফা সিদ্ধান্ত বিশ্ব ক্রিকেটে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও যারা বিশ্বকাপের মূল পরিকল্পনায় ছিল, স্রেফ আত্মসম্মান ও নিরাপত্তার দাবিতে অনড় থাকায় তারা আজ টুর্নামেন্টের বাইরে।

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, আইসিসি কি আসলেই বিশ্ব ক্রিকেটের অভিভাবক, নাকি কেবল নির্দিষ্ট একটি দেশের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার?