‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার ৩৬ দফা ব্লু-প্রিন্ট: এনসিপি-র ইশতেহারে তারুণ্য ও মর্যাদার জয়গান

0
‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার ৩৬ দফা ব্লু-প্রিন্ট: এনসিপি-র ইশতেহারে তারুণ্য ও মর্যাদার জয়গান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বিগত আমলের ক্ষত মুছে একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষে ৩৬ দফার মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে দলটির শীর্ষ নেতারা এই ইশতেহার উন্মোচন করেন। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’।

এই ইশতেহারে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট গাণিতিক লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরা হয়েছে।

সুবিচারের রাজনীতি: অপরাধের শিকড় উপড়ানোর অঙ্গীকার

এনসিপি-র ইশতেহারে প্রথম ও প্রধান গুরুত্ব পেয়েছে গত দেড় দশকের অপরাধের বিচার।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন: জুলাই ও শাপলা চত্বর গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং সব গুম-খুনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে এই কমিশন গঠন করা হবে। ‘হিসাব দাও’ পোর্টাল: জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালে প্রকাশ করা হবে, যা আমজনতার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা: মধ্যবিত্তের স্বস্তির রূপরেখা

বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এনসিপি ঘোষণা করেছে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ:

মুদ্রাস্ফীতি ও মজুরি: মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

স্মার্ট টিসিবি: ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ লাইন নয়, বরং এনআইডির মাধ্যমে নিবন্ধিত মুদি দোকান থেকেই মিলবে টিসিবির পণ্য।

ঋণখেলাপিদের সাজা: ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কঠোর আইন প্রণয়ন।

কর্মসংস্থান ও শিক্ষা: ১ কোটি কাজের টার্গেট

প্রজন্ম জে-এর আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে:

বিশাল কর্মযজ্ঞ: আগামী ৫ বছরে ১ কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল থাকবে।

শিক্ষার রূপান্তর: স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ এবং ৭৫% শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি। শিক্ষকদের জন্য থাকবে সম্পূর্ণ পৃথক বেতন কাঠামো।

রিভার্স ব্রেন ড্রেইন: বিদেশে থাকা গবেষকদের ফিরিয়ে আনতে ল্যাব ফান্ডিং ও সিনিয়রিটি সুবিধা প্রদান করা হবে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা

ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড: প্রত্যেক নাগরিকের এনআইডি ভিত্তিক ডিজিটাল স্বাস্থ্যের প্রোফাইল থাকবে। দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে ক্যানসার-হৃদরোগের জন্য বিশেষায়িত ‘হেলথ জোন’ হবে।

নারীর ক্ষমতায়ন: ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা এবং সরকারি চাকরিতে ঐচ্ছিক ‘পিরিয়ড লিভ’ ও বাধ্যতামূলক ডে-কেয়ার চালুর প্রস্তাব।

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের অন্তর্ভুক্তি: প্রথমবারের মতো ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সরকারি পে-স্কেলের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতি: শক্ত অবস্থানের ডাক

জাতীয় নাগরিক পার্টি তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে:

সীমান্ত ও ট্রানজিট: সীমান্ত হত্যা ও অভিন্ন নদীর পানি ইস্যুতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কূটনৈতিক চাপ এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা: সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে নিয়মিত ফোর্সের দ্বিগুণ ‘রিজার্ভ ফোর্স’ গঠন এবং ড্রোন (UAV) ব্রিগেড তৈরির পরিকল্পনা।

ইশতেহারের চমক জাগানিয়া ১০টি তথ্য:

ভোটাধিকারের বয়স: তরুণদের গুরুত্ব দিতে ভোটাধিকার ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছরে আনা।

রেমিটমাইলস: প্রবাসীদের জন্য বিমানে বিশেষ ট্রাভেল মাইলস সুবিধা।

ল্যাটেরাল এন্ট্রি: আমলাতন্ত্রে সরাসরি অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের নিয়োগ।

গ্রিন টেকনোলজি: ৫ বছরে ২৫% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন।

মা ও শিশু: ৬ মাস মাতৃত্বকালীন এবং ১ মাস পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান।

সুকুক ও আবাসন: ওয়াকফ সুকুকের মাধ্যমে গরিবদের জন্য আবাসন প্রকল্প।

ক্যাশলেস ইকোনমি: লেনদেন ডিজিটাল করে কর-জিডিপি ১২ শতাংশে উন্নীত করা।

আইসিইউ ও সিসিইউ: প্রতি জেলা হাসপাতালে অত্যাধুনিক লাইফ সাপোর্ট সুবিধা।

কৃষক ক্যাশব্যাক: সার-বীজের ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

বিডি ডায়াস্পোরা পোর্টাল: প্রবাসীদের এনআইডি-পাসপোর্টসহ সব সেবা এক ক্লিকে।

 

অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই ইশতেহার কেবল গদি দখলের দলিল নয়, এটি আমাদের নতুন প্রজন্মের মর্যাদার অধিকার আদায়ের ইশতেহার।”দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জোর দিয়ে বলেন, তারা দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ এক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে একটি রোডম্যাপ হাজির করেছেন।

বিদেশি কূটনীতিক ও সুশীল সমাজের উপস্থিতিতে ঘোষিত এই ইশতেহার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আমেজকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।