‘শূন্য নয়, আমরা মাইনাস থেকে শুরু করেছিলাম’: জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ী ভাষণ

0
‘শূন্য নয়, আমরা মাইনাস থেকে শুরু করেছিলাম’: জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ী ভাষণ

আজকের ডেস্কঃ দীর্ঘ ১৮ মাস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার পর আজ সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাত ৯টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি তার সরকারের অর্জন, চড়াই-উতরাই এবং নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।

ড. ইউনূস তার ভাষণের শুরুতেই জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ‘মহা মুক্তির দিন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন: “৫ আগস্ট কী এক অভাবনীয় আনন্দের দিন ছিল! দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা এ দেশকে বের করে এনেছে। যখন ছাত্ররা আমাকে এই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য খবর দিল, আমি তখন বিদেশে ছিলাম। প্রথমে রাজি না হলেও জাতির প্রতি কর্তব্য পালনের তাগিদে আমি ফিরে আসি। আজ ১৮ মাস পর আমার বিদায় নেওয়ার পালা।”

বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে, তারা ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। তার ভাষায়: “আমাদের প্রথম কাজ ছিল অচল দেশটিকে সচল করা। এটি ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত, তারাই রাষ্ট্রযন্ত্র চালাত। তারা পালিয়ে যাওয়ার পর এক মহাসংকট তৈরি হয়েছিল।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য আমাদের তিনটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল—সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। কতটুকু সফল হয়েছি, সেই বিচারের ভার আমি দেশবাসীর ওপর ছেড়ে দিলাম।”

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদের ওপর গণভোটকে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নজির হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

“দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনে দেশের সর্বত্র একটি ঈদের পরিবেশ ছিল।” নির্বাচনে জয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষকেই অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হতে পারেননি, তারাও জানবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে।”

নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে তিনি দেশবাসীর প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানান:রাজনীতিতে পেশিশক্তির বদলে নীতিনির্ভর চর্চা শুরু করার তাগিদ দেন তিনি।

ড. ইউনূস স্পষ্ট করে বলেন, “নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে তিনটি বিষয়ের কোনো বিকল্প নেই— শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততা।”

তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যা শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর অর্থনীতি নয়, বরং প্রযুক্তি ও মেধানির্ভর হবে।”

আগামীকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার নতুন নির্বাচিত সরকার শপথ নিতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের অবসান ঘটবে। ভাষণের শেষে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং বলেন, “আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।”