অর্থনৈতিক প্রতিবেদকঃ রাজধানীর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তির কোনো লক্ষণ নেই। গত ছয় মাসের ব্যবধানে মাছ, মাংস, ডিমের পাশাপাশি শাকসবজির দাম দফায় দফায় বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। নতুন করে সয়াবিন তেলের তীব্র কৃত্রিম সংকট এবং আটা-ময়দার মূল্যবৃদ্ধির কারণে পাউরুটিসহ বেকারি সামগ্রীর দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে। সার্বিকভাবে বাজারের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ও অস্থিরতায় হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ ভোক্তা।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল, কাপ্তান বাজার মিরপুর-১১ নম্বর কাঁচাবাজার ও কাঁঠালবাগানসহ রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে বাজার পরিস্থিতির এ উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে।
সরকার সম্প্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে মিল মালিক ও বিপণন কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার সয়াবিনের দাম ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। তবে বর্ধিত দাম ধার্য করার পরও খুচরা বাজারে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
শহরের বেশিরভাগ মুদি দোকানে চাহিদা অনুযায়ী বোতলজাত সয়াবিন তেল মিলছে না। কোম্পানিগুলোকে অগ্রিম অর্ডার দিয়েও ৩-৪ দিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
মিরপুর-১১ নম্বর কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী তানভির জানান, অয়েল কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত তেল দিচ্ছে না, ফলে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অন্য বিক্রেতারা জানান, প্রতি লিটারে সীমিত মাত্র ১ টাকা কমিশন থাকায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও তেল বিক্রি করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
বিদ্যুতের নতুন দর, চলমান গ্যাস সংকট ও বৈশ্বিক কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ায় আটা-ময়দার বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সরকারি সংস্থা টিসিবির (TCB) তথ্য অনুযায়ী প্রতি কেজি ৪৮-৫০ টাকা (এক মাস আগের চেয়ে ৩.১৬% বেশি)। খোলা ময়দা ৬৫-৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮৫ টাকা কেজি দরে।
আটা, ময়দা ও ডালডার রেকর্ড দামের কারণে শনিবার থেকে সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি’। সংগঠনের সভাপতি জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ২৫ হাজার থেকে বেড়ে ৩৬ হাজার টাকা হওয়ায় সরাসরি দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ টাকার রুটি বা প্যাকেটের দাম অপরিবর্তিত রেখে ৪০০ গ্রামের জায়গায় ওজন ৩২০-৩৫০ গ্রামে কমিয়ে ‘মূল্য সমন্বয়’ করা হবে।
খামারে লোকসান ও তাপদাহে চড়া প্রোটিনের বাজার (ডিম, মুরগি ও মাছ) প্রোটিনের প্রধান উৎস ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দামে কোনো ছাড় নেই।
ডিম ও মুরগি: বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা।
মূল কারণ: সাম্প্রতিক তীব্র গরম, অতিবৃষ্টি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে খামারে ব্যাপক মুরগি মারা গেছে। লোকসানের মুখে অনেক প্রান্তিক খামারি নতুন করে বাচ্চা তোলেননি, যা সরবরাহে সরাসরি ঘাটতি তৈরি করেছে।
মাছের বাজার: চাষের সাধারণ মাছের দামও এখন আকাশছোঁয়া। প্রতি কেজি তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০-২৫০ টাকা, মাঝারি রুই-কাতলা ৪০০-৪৫০ টাকা এবং পাবদা ও চিংড়ি যথাক্রমে ৪৫০ ও ১,০০০-১,৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারেও নেই কোনো সুখবর। বেগুন, করলা, বরবটিসহ অধিকাংশ সবজি কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। বর্তমান খুচরা মূল্য (প্রতি কেজি) গোল বেগুন ১০০ টাকা, লম্বা বেগুন ৭০ টাকা, করলা ও বরবটি ৮০ টাকা, আগাম শিম ১৮০ – ২০০ টাকা, টমেটো ১২০ – ১৪০ টাকা, পটোল / ঢ্যাঁড়স / কাঁকরোল ৬০ – ৮০ টাকা, দেশি শসা ৮০ – ১০০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা
বাজারে আয় ও ব্যয়ের অসঙ্গতিতে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান নেমে যাচ্ছে নিচে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে সরকারের কঠোর তদারকি দরকার।

