আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। একদিকে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন সামরিক উপস্থিতি, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যুদ্ধ প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। তেহরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনা সুরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো ঢেলে সাজানোর মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে এক কঠিন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে সাড়ে তিন ঘণ্টার একটি পরোক্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তা কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
আব্বাস আরাঘচি (ইরানি কূটনীতিক): উভয় পক্ষ কিছু ‘নির্দেশক নীতিমালায়’ একমত হয়েছে বলে দাবি করেন।
জেডি ভ্যান্স (মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট): তাঁর মতে, ট্রাম্প প্রশাসন যে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, ইরান তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এরই মধ্যে হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করা হয়েছে যে, মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী চলতি সপ্তাহান্তেই ইরান লক্ষ্য করে হামলা শুরু হতে পারে।
গত জুনে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও পারমাণবিক কর্মসূচির যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কাটিয়ে উঠছে তেহরান। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে: খোররামাবাদের ইমাম আলী ঘাঁটি এবং শাহরুদে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র দ্রুত পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তাবরিজ ও হামাদান বিমানঘাঁটির রানওয়েসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নতুন করে সচল করা হয়েছে। গ্লোবাল সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইসের মতে, ইরান সম্ভবত পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করছে।
মার্কিন বিমান হামলা থেকে বাঁচতে ইরান তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোকে মাটির গভীরে আরও সুরক্ষিত করছে।
নাতাঞ্জ কমপ্লেক্স: পাহাড়ের ভেতরের এই স্থাপনার প্রবেশপথ কংক্রিট ও মাটির পুরু স্তর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
‘তালেগান-২’ নামক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি এখন কংক্রিট ও মাটির স্তূপের নিচে, যা একে কার্যত একটি ‘অভেদ্য বাঙ্কারে’ পরিণত করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা সাধারণ বিমান হামলার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য মার্কিন ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা গুপ্তহত্যা ঠেকাতে নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন করেছেন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। গঠন করা হয়েছে নতুন ‘ডিফেন্স কাউন্সিল’। আইআরজিসি-এর সাবেক ঝানু কমান্ডার আলী শামখানিকে এই কাউন্সিলের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা যুদ্ধকালীন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে।
যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইরান কেবল অভ্যন্তরীণ সুরক্ষাই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আঘাত হানার অস্ত্রও তৈরি রাখছে। পারস্য উপসাগরে আইআরজিসি-এর মহড়ার কারণে বিশ্বের তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী ‘হরমুজ প্রণালী’ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ওমান উপসাগরে রাশিয়ার সাথে যৌথ মহড়া চালিয়ে ইরান নিজের সামরিক মিত্রদের শক্তির জানান দিয়েছে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর মনে করেন, ইরান এই প্রস্তুতির মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চাইছে—একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। তেহরানের এই ‘প্রতিরোধমূলক কৌশল’ আসলে হামলার আগেই তার চড়া মূল্য হিসাব করতে বাধ্য করছে ট্রাম্প প্রশাসনকে।
সিএনএন অবলম্বনে

