শাহজাদপুর প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে চাঁদা না পেয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে দুই কাপড় ব্যবসায়ীকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে জখম করার ঘটনার পর থেকে সশস্ত্র কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত দুইজনকে গ্রেফতার করলেও প্রধান আসামীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এদিকে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে দোকানপাট বন্ধ রেখে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ মিছিল, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল ) রবীন্দ্র কাচারি বাড়ি সংলগ্ন প্রধান সড়কে শাহজাদপুরের সর্বস্তরের জনগনের ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে এক বিক্ষোভ মিছিল শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদর্শন করে। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিকেলে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম তার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম জানান, গুরুতর আহত ব্যবসায়ী অন্তরের পিতা মানিক মিয়া বাদি হয়ে ২০ জনের নাম উল্লেখসহ আরো ১৫/২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ পৌরসভার দাবারিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে হাজী নুরুল ইসলামের ছেলে আবুল বাশার চেনি (৪০) ও মজিবর রহমানের ছেলে জালাল উদ্দিন সরকার (৩০)নামে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। তিনি আরো জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সাথে জড়িতদের সনাক্ত করে আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও তাদের ইন্ধনদাতারা যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না । একাধিক সূত্রে জানা গেছে, হামলার সঙ্গে জড়িতরা সবাই পৌরসভার দাবারিয়া মহল্লার প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে ওই গোষ্ঠীর কিশোর গ্যাং এলাকায় দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি সহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার অনেকেই অভিযোগ করেন, ওই সন্ত্রাসী চক্র ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের শরিক দল এনসিপির প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি প্রচারণায় অংশ নেয়। সচেতন মহলের মতে, শাহজাদপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে কিশোর গ্যাংয়ের এমন দুঃসাহসিক তৎপরতা হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পরোক্ষ মদদ রয়েছে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল)শাহজাদপুর বণিক সমিতির সভাপতি ও পৌর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি এমদাদুল হক নওশাদ জানান, একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার নানা বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘হৃদয়ে শাহজাদপুর” নামে একটি ফেইক আইডি থেকে নিয়মিত মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। শাহজাদপুরকে অশান্ত করতে যারা সোশাল মিডিয়াকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের লিপ্ত রয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরী। শাহজাদপুর বনিক সমিতির সভাপতি ইমদাদুল হক নওশাদ নারকীয় ও অমানবিক ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান। পাশাপাশি শাহজাদপুরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যাতে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন সেজন্য তিনি তার সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন । তিনি আরো বলেন, আমরা পরিচ্ছন্ন রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। সমাজে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করার হীন উদ্দেশ্যে স্বার্থান্বেষী মহল নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
স্থানীয় অভিজ্ঞ মহলের মতে, শান্তিপূর্ণ ও ব্যবসাবান্ধব জনপদ হিসেবে পরিচিত শাহজাদপুরে এ ধরনের সহিংসতা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি অশনিসংকেত। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনের কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান জানান, কিশোর গ্যাং ও তাদের গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। শাহজাদপুরে কিশোর গ্যাং বলে কারো অস্তিত্ব থাকবে না।
উল্লেখ্য, গত বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে একদল সন্ত্রাসী দারিয়াপুর বাজারের রবীন্দ্র কাচারি বাড়ির সংলগ্ন মানিক মিয়ার কাপড়ের দোকানে এসে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে । এ সময় দোকান মালিকের ছেলে অন্তর চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ২০/২৫ জন কিশোর গ্যাং দেশীয় অর্থশাস্ত্র নিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অন্তরকে এরোপাথালি কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। বাধা দিতে এলে তার বাবা মানিক মিয়াকেও সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে আহত করে। পরে ঔএলাকাবাসী আহত দুই ব্যবসায়ীকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে অন্তরকে প্রথমে সিরাজগঞ্জ এবং পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে অন্তর ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখম করার পাশাপাশি তাদের দোকান থেকে নগদ তিন লক্ষ টাকা সহ প্রায় ৮-৯ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

