আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়: ১৫ কর্মকর্তা আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত

0
আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়: ১৫ কর্মকর্তা আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গঠিত স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’-এর প্রাতিষ্ঠানিক পথচলা আনুষ্ঠানিকভাবে থমকে গেল। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ পাসের ধারাবাহিকতায় এবার এই বিশেষ সচিবালয়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি টানা হলো।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশানুসারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর মাধ্যমে সাবেক সিনিয়র সচিবসহ সচিবালয়ের কর্মরত জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন ও পৃথক অফিস আদেশে জানানো হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের নিম্নবর্ণিত ১৫ সদস্যকে পরবর্তী উপযুক্ত পদে পদায়নের লক্ষ্যে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে।

যদিও প্রজ্ঞাপনটি ১৯ মে জারি করা হয়েছে, তবে এটি বিগত ১০ এপ্রিল থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ, সংসদ কর্তৃক অধ্যাদেশ বাতিলের পরদিনই এই কর্মকর্তাদের যোগদানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংযুক্ত কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা: জেলা ও দায়রা জজ (৯ জন) এদের মধ্যে রয়েছেন বিলুপ্ত সচিবালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব শেখ আশফাকুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব বেগম শারমিন নিগার, মোহাম্মদ হালিম উল্ল্যাহ চৌধুরী, রুহুল আমীন এবং মো. হেমায়েত উদ্দিন। এ ছাড়া যুগ্মসচিব পদমর্যাদার মুন্‌সী আব্দুল মজিদ, মোহা. ইমদাদুল হক, বি এম তারিকুল কবীর ও মনজুর কাদেরকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (২ জন): উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা মো. হারুন রেজা ও মো. হাফিজুল ইসলাম।

যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (৩ জন): সুব্রত ঘোষ শুভ, বেগম মুহসিনা হোসেন তুষি এবং সাবেক সহকারী সচিব রুহুল আমীন।

জ্যেষ্ঠ সহকারী জেলা জজ (১ জন): বেগম সাদিয়া আফরীন ও মো. আরমান হোসেন (সিনিয়র সিভিল জজ)।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের ‘দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা’ (আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের যৌথ এখতিয়ার) বিলোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয় এবং ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন।

তবে দেশের সাধারণ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই স্বতন্ত্র সচিবালয় বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আপত্তি ও ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’-এর অভিযোগ নাকচ করে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আদালত আইন নিয়ে মত দিতে পারলেও আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদেরই। ফলে ১০ এপ্রিল এর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয়ের আইনি ভিত্তি চিরতরে বিলুপ্ত হয় এবং বিচারক নিয়োগ ও বদলিসহ যাবতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনরায় পূর্বের ন্যায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে যায়।

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের দীর্ঘ ইতিহাস ও মাসদার হোসেন মামলা, ১৯৭২ সালের সংবিধান: মূল সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল—”রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।”

দুই দশকের নিষ্ক্রিয়তা: সংবিধানে এই নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে পরবর্তী দুই দশকে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

১৯৯৪-১৯৯৭ (রিট ও হাইকোর্টের রায়): ১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন কাঠামো ও বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলে বিচারপতি মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ জন বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস হিসেবে গড়ে তোলার ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন।

১৯৯৯ (আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়): হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক ‘মাসদার হোসেন মামলার রায়’ প্রদান করেন। এই রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ বা সংসদের প্রভাবমুক্ত রাখা, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা এবং নিম্ন আদালতের জন্য স্বাধীন বাজেট প্রণয়নের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কাগজে-কলমে বিচার বিভাগ পৃথক করা হলেও, ২০২৫ সালে গঠিত হওয়া সেই কাঙ্ক্ষিত ‘পৃথক সচিবালয়’ ২০২৬ সালের এপ্রিলের সংসদীয় আইনের মাধ্যমে পুনরায় ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেল।