মগবাজার আদ্-দ্বীন ট্র্যাজেডি: ‘দমবন্ধ’ হয়েই মারা যায় ৬ শিশু, নার্সদের ‘চরম ইনসেনসিটিভিটি’ ও ডেসপারেট গাফিলতির প্রমাণ

0
৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ-দ্বীনের হাসপাতালের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

বাংলাদেশ প্রতিনিধিঃ রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে কোনো অলৌকিক কারণ নয়, বরং কাজ করেছে চিকিৎসাকর্মীদের চরম অবহেলা ও পৈশাচিক গাফিলতি। বদ্ধ ও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কক্ষে দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকায় তীব্র অক্সিজেন ক্রাইসিস’ (Oxygen Deprivation) এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষাক্ত মাত্রার কারণেই ‘শিশুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

আজ বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) বিকেলে সচিবালয়ে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই বিস্ফোরক তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।

ইনফোগ্রাফিক: কী ঘটেছিল সেই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র ভোরে?

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ নম্বর-২ এ তৈরি হয়েছিল এক নরককুণ্ড:

[৯০০ বর্গফুটের কক্ষ] ➔ [ধারণক্ষমতার বাইরে ৫০ জনের উপস্থিতি] ➔ [এসি বন্ধ ও ভেন্টিলেশনহীনতা] ➔ [কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষাক্ত বৃদ্ধি] ➔ [৬ নবজাতকের হাইপোক্সিয়া বা দমবন্ধ মৃত্যু]

তদন্তে উঠে আসা ৫টি ‘মারাত্মক সিকিউরিটি অ্যান্ড মেডিকেল ল্যাপস’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আদ্-দ্বীন হাসপাতালের প্রশাসনিক ও চিকিৎসাগত কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করে তদন্ত কমিটির কয়েকটি মূল ফাইন্ডিংস তুলে ধরেন:

ওভারক্রাউডিং বা ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড়: মাত্র ৯00 বর্গফুটের একটি সেনসিটিভ কক্ষে ১১ জন রোগীসহ প্রায় ৫০ জন মানুষ গাদাগাদি করে ছিল। অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতির কারণে ঘরের অক্সিজেন দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

‘নো-ডক্টর’ জোন: এত সংবেদনশীল একটি পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কোনো অন-ডিউটি চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না।

নার্সদের ‘অমানবিক ইনসেনসিটিভিটি’: নবজাতকদের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখেও দায়িত্বরত সেবিকারা কোনো ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স (EMR) দেখাননি। অভিভাবকদের আকুল আর্তিতে সাড়া না দিয়ে তারা দীর্ঘক্ষণ কালক্ষেপণ করেন এবং কোনো ডাক্তারকে ডাকেননি।

অনুপযুক্ত ভবন: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বর্তমান ভবনটি একটি আধুনিক ও নিরাপদ হাসপাতাল পরিচালনার জন্য মোটেও উপযোগী নয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “শিশুদের আকস্মিক শারীরিক অবনতির পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা ইমার্জেন্সি রেসপন্স ছিল না। সেবিকাদের কোনো জরুরি প্রশিক্ষণও নেই। এটি স্রেফ অবহেলা নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ।”

কোরবানির ঈদের আগের দিন ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি পুরো দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও ‘পাবলিক আউটক্রাই’ (জনরোষ) তৈরি করেছে। হাসপাতালটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “হাসপাতালটিতে বর্তমানে অনেক সাধারণ রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। তাই জনস্বার্থে আমরা হুট করে এটি বন্ধ করতে পারি না। তবে অপরাধের সাথে জড়িত প্রত্যেকের কঠোর আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আগামী রবিবারের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অ্যাকশন নেওয়া হবে।”

মেডিকেল এথিক্সের চরম অবক্ষয়:

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এই ঘটনাটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের ‘মেডিকেল এথিক্স’ (Medical Ethics) বা চিকিৎসা নৈতিকতার চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। একটি আধুনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসি বন্ধ থাকা বা আলো-বাতাস চলাচলের ন্যূনতম ভেন্টিলেশন না থাকা কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং এটি একটি ক্ষমার অযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। এখন দেখার বিষয়, আগামী রবিবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী দৃষ্টান্তমূলক অ্যাকশন নেয়।