শহিদুল ইসলাম :বুকের ভেতর স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা, ঘরে পড়ে আছে পরম স্নেহের বাবার নিথর দেহ এমন এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতেও অশ্রুসিক্ত চোখে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে হাজির হলো ১৮ বছর বয়সী মাসুমা আক্তার। বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্ন আর ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতেই শোকের পাহাড় চেপে ধরে পরীক্ষার খাতায় কলম চালাতে হয়েছে এই পরীক্ষার্থীকে।
বুধবার সকালে যশোরের বেনাপোল কেন্দ্রভিত্তিক শার্শা উপজেলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী মাসুমা আক্তার এই অদম্য মানসিকতার পরিচয় দেয়। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে বাবার দাফনকাজ ও জানাজায় অংশ নেয় সে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেনাপোলের নামাজগ্রামের নিজ বাড়িতে হঠাৎ স্ট্রোক করেন মাসুমার বাবা বিশিষ্ট আমদানিকারক ও মেসার্স তাজমহল ট্রান্সপোর্টের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সামাদ (৬৫)। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অকাল এই মৃত্যুতে পুরো পরিবারে নেমে আসে কান্নার রোল।
বুধবার সকালে বেনাপোল কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। সকাল ১০টার আগেই চোখ মুছতে মুছতে কেন্দ্রে প্রবেশ করে মাসুমা। সহপাঠী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সহায়তায় পরীক্ষা কক্ষে আসন গ্রহণ করে সে। এক হাতে চোখ ভিজে যাওয়া রুমাল সামলে, অন্য হাতে সে লিখে গেছে পরীক্ষার প্রতিটি উত্তর। পরীক্ষা শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগেই (দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে) খাতা জমা দিয়ে দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় সে।
মাসুমা বলে, বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। সব সময় বলতেন পড়াশোনা করে অনেক বড় হতে হবে। এই অবস্থায় পরীক্ষা না দিলে বাবার আত্মা কষ্ট পেত। তাই বাবার ইচ্ছেপূরণ করতেই আমি পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছিলাম।
বেনাপোল কলেজের কেন্দ্রসচিব ও অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান শান্তি জানান, সকালেই আমরা তার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারি। শোক সামলে সে যাতে সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিতে পারে, সেজন্য আমরা মানসিকভাবে তার পাশে ছিলাম। তাকে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ হাসানুজ্জামান অনুপম বলেন, মাসুমা বিজ্ঞান বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী ও নিয়মিত শিক্ষার্থী (রোল নম্বর: ৫০৫৯১১)। এই কঠিন সময়ে কলেজের শিক্ষকরা এবং সহপাঠীরা তার পাশে গিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছে। সে যাতে পুরো পরীক্ষাটা ভালোভাবে শেষ করতে পারে, আমরা সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ এই ঘটনার বিষয়ে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, বাবাকে হারানোর কষ্ট অপরিসীম। এই চরম শোকের মধ্যেও মাসুমার সাহসিকতা ও দায়িত্ববোধ প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা তার সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর রাখছি এবং পাশে থাকার চেষ্টা করছি।
দুপুরে পরীক্ষা শেষ করে মাসুমা বাড়ি ফেরার পর জোহরের নামাজ শেষে স্থানীয় নামাজগ্রাম মসজিদে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এলাকার শত শত মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও আত্মীয়স্বজন জানাজায় অংশ নেন। পরে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

