গরিবের আটা খোলাবাজারে হরিলুট! ‘মিলেমিশে খাওয়া’ জয়পুরহাটের ৩ খাদ্য কর্মকর্তার কপাল পুড়ল

0
গরিবের আটা খোলাবাজারে হরিলুট! ‘মিলেমিশে খাওয়া’ জয়পুরহাটের ৩ খাদ্য কর্মকর্তার কপাল পুড়ল

জয়পুরহাট প্রতিনিধিঃ সরকারি নির্ধারিত দামে সাধারণ মানুষের কাছে চাল-আটা পৌঁছে দেওয়ার কথা ওএমএস (খোলাবাজারে বিক্রি) ডিলার ও খাদ্য কর্মকর্তাদের। কিন্তু সেই বরাদ্দের অর্ধেক আটা খোলাবাজারে বিক্রি করে আত্মসাতের অভিযোগ উঠতেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে রসিকতা করে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা বলে বসলেন—“সবাই মিলেমিশে খাই!”

অসংবেদনশীল ও বিতর্কিত এই মন্তব্য সম্বলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। তোলপাড় সৃষ্টি হয় খাদ্য প্রশাসনে। তীব্র জনরোষের মুখে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার সেই আলোচিত উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তাসহ মোট তিন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো হরিলুটের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে খাদ্য অধিদপ্তর গঠন করেছে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জয়পুরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাকিল আহমেদ।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ৩ কর্মকর্তা হলেন হুমায়ূন আহম্মেদ — কালাই উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা, মো. মাহমুদুন্নবী সরকার — উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক, আব্দুল মোমিন — সহকারী উপ-খাদ্য পরিদর্শক

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় ওএমএস কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিনের সরকারি বরাদ্দ ২ টন (২ হাজার কেজি) চাল এবং ২ টন আটা। নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী একজন নিম্নআয়ের সুবিধাভোগী ২৭০ টাকায় ৫ কেজি চাল এবং ৫ কেজি আটার একটি প্যাকেজ পাওয়ার কথা।

কিন্তু ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিনের নির্ধারিত ৪০ বস্তা আটার জায়গায় তোলা হতো মাত্র ২০ বস্তা। বাকি ২০ বস্তা আটা দুস্থদের না দিয়ে ওএমএস ডিলার ও কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট গোপনে চড়া দামে বাইরের খোলাবাজারে বিক্রি করে পুরো টাকা পকেটে পুড়তো।

প্রতিদিন সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হতো শত শত নিম্নআয়ের মানুষকে। তারা চাল পেলেও বলা হতো, “আটা শেষ হয়ে গেছে!”

ভুক্তভোগী স্থানীয় নারী সাবেরা বিবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা পেটের দায়ে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ি। পরে বলে আটা শেষ, কিন্তু চাল পাওয়া যেতো। পরে জানতে পারি পুরো আটা বেচেই হতো না, অর্ধেক আগেই চুরি হতো! গরিবের পেট কেটে এইভাবে লুটপাট চালবে, তা কী করে মেনে নেওয়া যায়?”

আটা গায়েবের এই পুকুরচুরি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা অনুসন্ধানে নামেন। ওএমএসের আটা চালানের তছরুপ ও ওজনে কম দেওয়া প্রসঙ্গে কালাই উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা হুমায়ূন আহম্মেদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি গম্ভীর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে হেসে ওঠেন এবং ক্যামেরার সামনেই মন্তব্য করেন—“সবাই মিলেমিশে খাই!”

তার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অবহেলামূলক মন্তব্যের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উন্মুক্ত হতেই মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হয়। দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠলে নড়েচড়ে বসে খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

ভিডিও ভাইরাল ও দুর্নীতি প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর খাদ্য অধিদপ্তর দ্রুত ব্যবস্থা হিসেবে তিন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করে। পাশাপাশি পুরো সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জয়পুরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাকিল আহমেদ বলেন, “ঘটনার গভীরতা বিবেচনা করে অভিযোগ পাওয়ার পরই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তিন অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে বরখাস্তের পাশাপাশি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে এলেই বরখাস্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় চূড়ান্ত শাস্তির পাশাপাশি প্রয়োজনে কঠোর ফৌজদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এই ঘটনায় কালাই উপজেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি দেখা গেলেও, খাদ্য বিভাগের এমন রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির খবরে সর্বস্তরে চরম ক্ষোভ বজায় রয়েছে।