বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের একটি আলোচিত ভিডিও ও একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনীতিতে তীব্র জলঘোলা তৈরি হয়েছে। দলীয় পক্ষ থেকে শুরুতে ভিডিওটিকে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা ‘এআই (AI)’ প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি অপপ্রচার বলে দাবি করা হলেও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ও স্থানীয় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ সব নতুন তথ্য।
গত ২৮ জুলাই প্রতিমন্ত্রীর একটি ২০ সেকেন্ডের স্পর্শকাতর ভিডিও ও একাধিক ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়। ঘটনার পরপরই দলীয় পদ হারানোর ভয়ে প্রতিমন্ত্রীর আদেশে পঞ্চগড়, বোদা ও দেবীগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এবং সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেসময় তারা দাবি করেন, প্রতিমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে প্রতিপক্ষ এআই দিয়ে এই প্রযুক্তিগত জালিয়াতি করেছে।
তবে প্রতিমন্ত্রীর দলীয় সমর্থকদের সেই এআই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য ডিসেন্ট’। সংস্থাটি জানিয়েছে, ছড়ানো ছবি ও ভিডিওগুলো কোনোভাবেই এআই বা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা নয়।
পঞ্চগড় ও ঢাকার সাংবাদিকদের সংগৃহীত মূল ছবি, ভিডিও এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের উচ্চ রেজল্যুশনের ফাইলগুলো বিশ্বমানের একাধিক এআই অ্যালগরিদম টুলে গভীর পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে পরীক্ষাগারের ফলাফলে কোনো ফাইলই এআই বা ডিপফেকের মাধ্যমে তৈরির প্রমাণ মেলেনি। অর্থাৎ ছড়িয়ে পড়া কনটেন্টগুলো সম্পূর্ণ বাস্তব ও আসল।
হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রমাণের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে দ্য ডিসেন্ট ওই নারীর আসল পরিচয় উদঘাটন করেছে। ১৯৯৫ সালের জুনে জন্ম নেওয়া ২৭-২৮ বছর বয়সী ওই নারী প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকা পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের অধিবাসী।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর থেকেই মূলত শিশুটির পড়ালেখার যাবতীয় অভিভাবকত্ব ও দায়িত্ব বহন করছিলেন ফরহাদ হোসেন আজাদ নিজেই। বর্তমানে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে চাকরির চেষ্টা করা ওই তরুণীর মা ও এক ভাই রয়েছেন।
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে পাঁচপীর বাজার ও আশপাশের এলাকায় সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ‘এশিয়া পোস্ট’। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মী জানান, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর নারী ও প্রতিমন্ত্রী একে অপরকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও পারিবারিক ‘ভাইয়া’ ও ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করতেন।
এমনকি ওই তরুণী বিগত জাতীয় নির্বাচনে ফরহাদ হোসেন আজাদের পক্ষে সরাসরি প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে মন্ত্রণালয়েও প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেন তিনি এবং নিজ এলাকার রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের জন্য দরবার করেছিলেন।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি নেতাকর্মীরা আক্ষেপ করে জানান, প্রতিমন্ত্রীর কথামতো আন্দোলনে না নামলে পদ-পদবি হারানোর ভয়, ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড কমিটি ভেঙে দেওয়া, এমনকি প্রকাশ্য অপমান ও শারীরিক লাঞ্ছনার হুমকি দেওয়া হয়। ফলে পদ রক্ষা এবং প্রতিমন্ত্রীর শাস্তির ভয়েই সাধারণ কর্মীরা বাধ্য হয়ে মাঠে মিথ্যা দাবিতে মিছিল-মানববন্ধন করছেন।
সামাজিক মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের পর এআই তত্ত্বের অসারতা স্পষ্ট হওয়ায় এখন গোটা পঞ্চগড়জুড়ে রাজনৈতিক পরিবেশ থমথমে এবং এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক নতুন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

