‘কোটি টাকার মানহানি মামলা’: আইনি অজ্ঞতা নাকি ভুল কৌশলের ফাঁদ?

0
‘কোটি টাকার মানহানি মামলা’: আইনি অজ্ঞতা নাকি ভুল কৌশলের ফাঁদ?

সাইফুল আলম : আদালতের বারান্দায় প্রায়ই একটি খবর আলোচনার ঝড় তোলে—‘অমুকের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার মানহানির মামলা!’ সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কি সত্যিই কেউ কখনো ক্ষতিপূরণ হিসেবে পায়? উত্তর হলো: প্রায় কখনোই না।

চিকিৎসকের একটি ভুল যেমন রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারে, তেমনি আইনজীবীর কৌশলগত কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার ভুল ক্লায়েন্টের কাঙ্ক্ষিত বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কোটি টাকার মানহানির দাবি তোলার এই ভুল চর্চাটি কেন হচ্ছে এবং এর সঠিক আইনি ব্যাখ্যাই বা কী—আসুন জেনে নেওয়া যাক।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির (The Penal Code, 1860) ৪৯৯ ধারায় মানহানিকে একটি ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে—কেউ যদি মৌখিকভাবে, লিখিতভাবে, কোনো রূপক বা ইশারা-ইঙ্গিতে কারও সুনাম ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে বা সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে জেনেও কোনো মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য প্রচার করে, তবে তা মানহানি হিসেবে গণ্য হবে।

দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা অনুযায়ী, এই অপরাধের বিচার করেন একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। আর এর সর্বোচ্চ শাস্তি ২ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।

সমস্যাটি যেখানে: ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের কাজ হলো আসামি অপরাধটি করেছেন কিনা তা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা এবং দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে দণ্ড দেওয়া। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কোনোভাবেই ভুক্তভোগীকে কোটি টাকার ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না। তাছাড়া, সম্মান বা মান-সম্মানের কোনো নির্দিষ্ট ‘বাজারমূল্য’ বা আর্থিক পরিমাপক হতে পারে না।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, আইনজীবীরা কেন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টেই ১ কোটি বা ১০০ কোটি টাকার মানহানির আরজি জমা দেন?

এর মূল কারণ—আইনি কৌশলের অস্পষ্টতা। অনেক আইনজীবী বা বাদী মানহানির কারণে সৃষ্ট ‘আর্থিক ক্ষতি’ এবং ‘অপরাধমূলক মানহানি’—এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেন। ফৌজদারি মামলায় কোটি টাকা উল্লেখ করার মাধ্যমে হয়তো আসামি কর্তৃক বাদীর সামাজিক, ব্যক্তিগত বা পেশাগত আর্থিক ক্ষতির বিশালত্ব বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আইনি কাঠামোর দিক থেকে এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ও অকার্যকর পদ্ধতি।

ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সঠিক আইনি পথ: দেওয়ানি বনাম ফৌজদারি

মানহানির কারণে কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তার সামনে দুটি ভিন্ন আইনি পথ খোলা রয়েছে দণ্ড বা শাস্তির জন্য (ফৌজদারি মামলা / CR Case)

আসামির শাস্তি নিশ্চিত করতে ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ‘সিআর মামলা’ করতে হবে। এই মামলায় টাকার অঙ্কে কোনো মানহানি দাবি করা যাবে না; উদ্দেশ্য থাকবে আসামির কারাদণ্ড বা জরিমানা নিশ্চিত করা।

আর্থিক ক্ষতিপূরণের জন্য (দেওয়ানি মামলা / Civil Suit): মানহানির রটনার ফলে যদি বাদীর ব্যবসায়িক ধস নামে বা সুনির্দিষ্ট আর্থিক ক্ষতি হয়, তবে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) মামলা করতে হবে।

শর্ত: আরজিতে কীভাবে, কী মাধ্যমে বদনাম করা হয়েছে এবং তার ফলে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে।

কোর্ট ফি (Court Fees): দাবীকৃত মোট ক্ষতিপূরণের অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে দেওয়ানি আদালতের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে ‘মূল্যানুপাতিক কোর্ট ফি’ (Ad valorem Court Fee) পরিশোধ করে মামলা দায়ের করতে হবে।

দুটি মামলা কি একসাথে চালানো সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। মানহানির শিকার ব্যক্তি ফৌজদারি ও দেওয়ানি—উভয় আদালতেই একই সাথে দুটি মামলা দায়ের করতে পারেন।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ফৌজদারি মামলাটি আগে নিষ্পত্তি হওয়া যুক্তিযুক্ত। কারণ, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের (The Evidence Act, 1872) ৪৩ ধারার বিধান অনুযায়ী, ফৌজদারি আদালতের রায় বা সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে দেওয়ানি মামলায় একটি ‘প্রাসঙ্গিক ঘটনা’ (Relevant Fact) হিসেবে গণ্য হবে। ফৌজদারি মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলে দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ অনেক সহজ হয়ে যায়।

মানহানি মামলার ক্ষেত্রে আইনি ধারার সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের কাছে কোটি টাকার অর্থ দাবি করা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে হাস্যকর এবং কৌশলগতভাবে ভুল। একটি ফৌজদারি মামলাকে কখনোই সরাসরি টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না।

তাই সুবিচার ও কাঙ্ক্ষিত ক্ষতিপূরণ পেতে হলে বাদী ও তার আইনজীবীদের স্পষ্ট হতে হবে—তারা কি আসামির জেল-জরিমানা চান, নাকি আর্থিক ক্ষতিপূরণ চান? সঠিক আদালতে সঠিক নিয়মে মামলা দায়ের করতে না পারলে ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় বাদীর সময় ও অর্থ—দুটোই অপচয় হবে।

 

লেখকঃ আইনজীবী

[email protected]

01711942294