অপরাধ দমন ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় আইন তৈরি হলেও এর ভেতরে থাকা নানা ফাঁকফোকড় ও অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের মারপ্যাঁচ এবং দুর্বল প্রয়োগের কারণে বিচারব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায়ই অধরা থেকে যায়। সাম্প্রতিক আইনগত সংস্কার ও বিচার বিভাগীয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আইন হালনাগাদ না করায় এবং তদন্তে প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ না থাকায় আইনের সুফল ব্যাহত হচ্ছে।
আইনের প্রধান ৫টি ফাকফোকড় ও সংকটঃ অধিকাংশ পুরোনো আইনে সুস্পষ্ট সংজ্ঞার অভাব রয়েছে। ‘যুক্তিসঙ্গত কারণ’ বা ‘বিশেষ পরিস্থিতি’-র মতো শব্দমালার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী আসামিরা সহজে জামিন বা খালাস পেয়ে যায়।
অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তদন্তে বিলম্ব করা এবং ভুলভাবে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) তৈরি করা আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সাক্ষীর অভাব বা সন্দেহাতিতভাবে প্রমাণ বা ভুল প্রমাণের অজুহাতে অপরাধী পার পেয়ে যায়।
অনেক গুরুতর অর্থনৈতিক অপরাধ ও সাইবার অপরাধকে জামিনযোগ্য ধারায় রেখে দেওয়ায় আসামিরা সহজেই আদালত থেকে জামিন পেয়ে বাইরে এসে প্রমান লোপাটের চেষ্টা করে।
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল প্রমাণ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনগুলো অনেক সময় নীরব বা অপ্রতুল। ফলে সাইবার অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
মামলা দীর্ঘায়িত হলে সাক্ষীরা ভয়ভীতি বা প্রলোভনে পড়ে নিজেদের বক্তব্য বদলে ফেলে (Hostile Witness)। দেশে শক্তিশালী ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ না থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া ভেস্তে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবীদের মতে, বিত্তবান ও প্রভাবশালীরা মূলত প্রাক-বিচার বা তদন্ত চলাকালীনই আইনের ফাকফোকড়গুলোকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং আপিল প্রক্রিয়ার ধাপ পার হতে হতে আসল বিচার অনেক সময় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
উত্তরণের উপায় ও সম্ভাব্য সমাধানঃ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ব্রিটিশ আমলের পুরোনো ও অস্পষ্ট ধারা সংশোধন করে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করা। পুলিশ বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক চাপ কমিয়ে স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক তদন্ত দল গঠন করা। গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে আইন পাস করা। মামলা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে না রেখে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি করা।
আইনের কঠোরতা শুধু কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োগের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
লেখকঃ সাইফুল আলম
আইনজীবী, ০১৭১১৯৪২২৯৪ (মোবা)
[email protected]

