অ্যান্টার্কটিকার বরফ ভেদ করে ‘ভূতুড়ে’ কণার সন্ধান: পদার্থবিজ্ঞানে একক নোবেল জিতলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন

0
অ্যান্টার্কটিকার বরফ ভেদ করে 'ভূতুড়ে' কণার সন্ধান: পদার্থবিজ্ঞানে একক নোবেল জিতলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ অ্যান্টার্কটিকার মাইলকে মাইল হিমবাহের গভীরে স্থাপিত বিশ্ববিখ্যাত ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’র রূপকার এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো কণা শনাক্তকরণের যুগান্তকারী সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন বেলজিয়ামীয় বংশোদ্ভূত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রেস মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলগত গবেষণায় নোবেল বাঁটায়নের যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা ভেঙে এবার একক বিজ্ঞানী হিসেবে হ্যালজেনকে এই বিরল সম্মানে ভূষিত করা হলো।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ফ্রান্সিস হ্যালজেন ১৯৮৮ সালে প্রথম অ্যান্টার্কটিকার বরফে বিশাল এক কণা শনাক্তকারী যন্ত্র তৈরির প্রাথমিক পরিকল্পনা পেশ করেন। তবে সে সময় বৈজ্ঞানিক মহলে এই পরিকল্পনাকে অসম্ভব ও অলীক কল্পনা হিসেবে দেখা হতো।

পুরস্কারের খবর পাওয়ার পর ইতালিতে অবস্থানরত অধ্যাপক হ্যালজেন টেলিফোনে অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “পুরস্কার পাওয়ার ঘটনাটি আমার জন্য যেমন বিশাল বিস্ময়ের, তেমনি পরম আনন্দের। প্রকল্পটির শুরুতে সবাই এটাকে ভালো একটা ধারণা বললেও বাস্তবে সফল হবে—এমন বিশ্বাস প্রায় কারও ছিল না; এমনকি আমারও দ্বিধা ছিল। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক অভিযান ছিল, যেখানে জয়ের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।”

মহাবিশ্ব বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল বাঁধা হলো ‘ভূতুড়ে কণা’ বা নিউট্রিনো। এই কণাগুলোর ভর প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, নেই কোনো বৈদ্যুতিক আধান। ছায়াপথ, তারা বা গ্রহের মধ্য দিয়ে প্রায় কোনো মিথস্ক্রিয়া ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে চলে যেতে পারে এসব কণা। তবে অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্র হিসেবে নিউট্রিনো যখন কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন সূক্ষ্ম আলোর ঝলক তৈরি করে।

হ্যালজেনের নকশাকৃত আইসকিউব অবজারভেটরি অ্যান্টার্কটিকার চরম স্বচ্ছ বরফের নিচে গভীর সেন্সর বসিয়ে ঠিক সেই আলোর ক্ষুদ্র ঝলক বা ‘চেরেনকভ রেডিয়েশন’ নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে। এতে করে গভীর মহাবিশ্বের চরম বৈরী পরিবেশ, সুদূর গ্যালাক্সি কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে।

আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ফিজিকস প্রকাশিত ‘ফিজিক্স টুডে’র প্রধান সম্পাদক রিচার্ড ফিটজেরাল্ড এই নোবেল জয়ের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন, “বহু বছর পর একক দূরদর্শী কোনো বিজ্ঞানীকে নোবেল দেওয়া হলো, যা তাঁর অদম্য দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করে। যদিও বর্তমান আইসকিউব প্রকল্পে শত শত প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী নিয়োজিত, তবে এই বৈপ্লবিক চিন্তার সূচনা করেছিলেন কেবল একজন মানুষ—ফ্রান্সিস হ্যালজেন।”

হ্যালজেনের এই উদ্ভাবন ‘মাল্টি-মেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমি’ বা বহুমাত্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। এখন মহাবিশ্বকে কেবল সাধারণ আলো বা তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ দিয়ে নয়, বরফের নিচ থেকে পাওয়া ভূতুড়ে কণার বার্তা বিশ্লেষণ করেও দেখা সম্ভব হচ্ছে।

এর আগে সোমবার (৫ অক্টোবর) অপটোজেনেটিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী উন্মোচনের স্বীকৃতি হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে তিন বিজ্ঞানী নোবেল পান। প্রথা অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের বুধবারে রসায়ন, বৃহস্পতিবারে সাহিত্য, এবং শুক্রবারে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। পরবর্তীতে আগামী সোমবার অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ বছরের নোবেল মেলা।

এ বছর নোবেল পুরষ্কারের অর্থমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার)। পদার্থবিজ্ঞানে এককভাবে বিজয়ী হওয়ায় পুরো অর্থই পাবেন অধ্যাপক ফ্রান্সিস হ্যালজেন।

উল্লেখ্য, বিগত ২০২৫ সালে অতিক্ষুদ্র সাব-অ্যাটমিক কণার ‘কোয়ান্টাম টানেলিং’ আচরণের গবেষণায় অসামান্য অবদান রেখে পদার্থবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পেয়েছিলেন তিন বিজ্ঞানী, যা বর্তমানে উন্নত এমআরআই এবং অতি-দ্রুতগতির সেমিকন্ডাক্টর চালিত স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।