রাতের আঁধারে ইলেকট্রিক শকে বিপন্ন টাঙ্গুয়ার হাওর: মাছের সাথে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, প্রশ্নবিদ্ধ নজরদারি

0
রাতের আঁধারে ইলেকট্রিক শকে বিপন্ন টাঙ্গুয়ার হাওর: মাছের সাথে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, প্রশ্নবিদ্ধ নজরদারি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: রাত নামলেই রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর যেন নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে যায়। দূর থেকে শান্ত জলরাশি ঘুমিয়ে আছে মনে হলেও, রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর অসাধু শিকারি মেতে উঠছে প্রাণঘাতী এক খেলায়। পানিতে নামানো হচ্ছে ব্যাটারিচালিত ‘ইলেকট্রিক শক মেশিন’। মুহূর্তেই অবশ হয়ে ভেসে উঠছে ছোট-বড় মাছ। তবে এই সহজ শিকারের পেছনে নিঃশব্দে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য পোনা, ধ্বংস হচ্ছে কোটি কোটি ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী—ধীরে ধীরে চিরতরে বিপন্ন হতে বসেছে হাওরের মূল জীববৈচিত্র্য।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর (বুধবার) দিবাগত রাতে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবীর নির্দেশনায় হাওর সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা রূপনগর আনসার ক্যাম্পের সদস্যরা তেকুইন্যা এলাকার বেরবেরিয়া বিলে একটি ঝটিকা অভিযান চালান। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে শিকারিরা পালিয়ে গেলেও হাওরের বাঁধসংলগ্ন একটি উঁচু স্থান থেকে ৩টি ১২ ভোল্টের শক্তিশালী ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক নেট জালসহ শক দিয়ে মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

পরবর্তীতে গত ৫ অক্টোবর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিএমএসআর আলিফের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্য একটি অভিযানে আরও ৭টি কোনাজাল ও কারেন্ট জাল জব্দ করা হয় এবং অবৈধ মৎস্য শিকারের দায়ে ৬ জনকে তাৎক্ষণিক অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, রাতের আঁধারে নৌকা নিয়ে হাওরে নামা শিকারিরা ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত ইলেকট্রোড পানিতে নামিয়ে তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ তৈরি করে। এতে নির্দিষ্ট এলাকার মাছের স্নায়ুতন্ত্র অবশ হয়ে পড়ে এবং সেগুলো সহজে ভেসে ওঠে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপনগর গ্রামের এক যুবক জানান, তেকুইন্যা ও বেরবেরিয়াসহ বেশ কয়েকটি বিলে প্রায় প্রতিরাতেই বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রিক শক মেশিনের সাহায্যে মাছ নিধন করা হচ্ছে। তবে চরম উদ্বেগের বিষয় হলো—এত কড়া পাহারা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে রাতে এসব ভারী সরঞ্জাম হাওরে ঢুকছে এবং অবাধে ব্যবহার হচ্ছে?

বিদ্যুৎ দিয়ে মাছ ধরার কৌশলকে সমগ্র জলজ প্রতিবেশের জন্য ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করছেন গবেষক ও পরিবেশবাদীরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাওর ও জলাভূমি গবেষক কৃষিবিদ মো. আল-ফাহাদ বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওরে ‘ইলেকট্রনিক ফিশিং’ অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বিদ্যুৎ প্রয়োগের ফলে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা ও ডিম এক লহমায় ধ্বংস হয়ে যায়, যা প্রাকৃতিক প্রজনন চক্রকে পুরোপুরি ভেঙে দিচ্ছে।”

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা সতর্ক করে বলেন, “এতে শুধু মাছ নয়; ব্যাঙ, জলজ কীটপতঙ্গসহ পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস হচ্ছে। এটি বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে হাওর পুরো মাছশূন্য হয়ে পড়বে।”

সিএনআরএস-এর প্রকল্প উন্নয়ন কর্মী ছাইফুল চৌধুরী বলেন, “এটি জলজ প্রতিবেশের পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। কারণ ব্যবহারকারীরা নিজেরাও যেকোনো সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারাতে পারেন।”

শুধু মাঝে মাঝে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে কয়েকটি সরঞ্জাম জব্দ বা জরিমানা করেই টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাঁরা প্রশাসনিক নজরদারির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন: সংরক্ষিত এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর নিয়মিত টহলের রেকর্ড ও নজরদারি কতটা কার্যকর? বার বার একই বিলে অবৈধ শিকার চলার পেছনে মাঠপর্যায়ের কারও গাফিলতি আছে কি না? জব্দ হওয়া সরঞ্জামের উৎস ও মূল ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে কি না?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক অভিযানের পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীদের তালিকা তৈরি, হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় নাগরিকদের সমন্বয়ে গ্রামভিত্তিক ‘সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলাই হতে পারে টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ রক্ষার একমাত্র স্থায়ী পথ।