
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকান পার্টির ঐতিহাসিক পরাজয় এবং ডেমোক্র্যাটদের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন তীব্রতর করেছেন তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা। তাদের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর একরোখা নীতি ও মার্কিন রাজনীতিতে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় আস্থার সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এবং এর জেরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে মার্কিন সাধারণ মানুষের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, সেটাই রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।
নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। চাপের মুখে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ২০২৬ সালের মধ্যে ইসরায়েলকে প্রতিবছর দেওয়া প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক এবং প্রখ্যাত গবেষক শিবলি তালহামির মতে, মার্কিন ভোটাররা একে ‘রাজনৈতিক সুনামি’ হিসেবে দেখছেন, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যয়বহুল সংঘাতে ওয়াশিংটনের জড়ানোকে সাধারণ মানুষ আর সহজভাবে মেনে নিচ্ছে না।
এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনেও বড় ধাক্কা খেয়েছেন দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার ডানপন্থি জোট মাত্র ৫৩টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন পেতে তাকে চরম দর-কষাকষির মুখে পড়তে হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের মধ্যস্থতায় নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া যখন চলছে, ঠিক তখনই মার্কিন নির্বাচনের ফল নেতানিয়াহুর বিরোধীদের আরও শক্তিশালী করেছে। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট ও ইয়ার লাপিদ সাফ জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর উগ্র নীতি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক মর্যাদাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। মধ্য-বামপন্থি নেতা ইয়ার গোলানের ভাষায়, “মার্কিন নির্বাচনের ফল প্রমাণ করেছে নেতানিয়াহু এখন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের জন্যই ক্ষতিকর এক বোঝা।”
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু এতদিন ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থনের ওপর ভর করে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প নিজেই এখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও ক্ষতবিক্ষত। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি এখন মৌলিকভাবে বদলে গেছে। ৩.৮ বিলিয়ন বা ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক অনুদান এবং আধুনিক অস্ত্রের জোগান নিয়ে যে নির্ভরশীলতা ছিল, তা ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উডি সোমার সতর্ক করে বলেছেন, হোয়াইট হাউসে ক্ষমতার পালাবদল না ঘটলেও ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত নতুন কংগ্রেস এখন যেকোনো সময় কঠোর শুনানি, তদন্ত ও বাজেটের মাধ্যমে ইসরায়েলকে কঠিন চাপের মুখে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটনে মিত্রের পরাজয় এবং তেল আবিবে নিজের আসন হারানোর শঙ্কার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলি রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর যুগ এখন চরম অনিশ্চয়তা ও গভীর সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
