আইনশৃঙ্খলা জোরদারে পুলিশে ১৪ হাজার নিয়োগ: পিআরবি সংশোধন করে ৪ হাজার এসআই পদে শতভাগ সরাসরি নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত

0
আইনশৃঙ্খলা জোরদারে পুলিশে ১৪ হাজার নিয়োগ: পিআরবি সংশোধন করে ৪ হাজার এসআই পদে শতভাগ সরাসরি নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত

বিশেষ প্রতিনিধিঃ দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির রূপান্তর, সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে বিশাল জনবল নিয়োগের বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন নীতিমালার আওতায় মোট ১৪ হাজার পদে নতুন নিয়োগের প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কনস্টেবল এবং ৪ হাজার উপপরিদর্শক (এসআই) পদ রয়েছে।

তবে এই নিয়োগের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন দিকটি হলো— ৪ হাজার এসআই পদের শতভাগ পদে সরাসরি নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রচলিত প্রথা ভেঙে কেবল নতুনদের সুযোগ দিতে ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি)।

গত বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের উপস্থিতিতে এই বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।

প্রচলিত বিধিমালা বা পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, এসআই পদের ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ সরাসরি খোলা নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হতো। সেই নিয়মে ৪ হাজার পদের মধ্যে ২ হাজার পদে মাঠপর্যায়ে কর্মরত যোগ্য সদস্যদের পদোন্নতির সুযোগ থাকার কথা ছিল।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পুলিশের কার্যক্রম গতিশীল করতে ‘বিশেষ বিবেচনায় এককালীন’ এই প্রবিধান সংশোধন করে সব কটি পদ সরাসরি নিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই ১৪ হাজার জনবলের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রশাসন।

সরাসরি ৪ হাজার পদে নতুনদের নিয়োগের সিদ্ধান্তের ফলে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা অভিজ্ঞ এএসআই ও কনস্টেবলদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরির আশাদোঘ মেঘ দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে বিভাগীয় পদোন্নতির পথ সংকুচিত হলে মাঠপর্যায়ে পেশাদার সদস্যদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা প্রাতিষ্ঠানিক অসন্তোষের রূপ নিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে পদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এটি ‘একবারের বিশেষ পদক্ষেপ’। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার এ বিষয়ে পর্যালোচনা করতে পারবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্রমতে, বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময়ে পুলিশ বাহিনীতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য (কনস্টেবল, এসআই ও সার্জেন্ট) নিয়োগ পান, যা বর্তমান বাহিনীর মোট জনবলের প্রায় অর্ধেক। ওই সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ এবং পুলিশকে ক্ষমতার ঢাল হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপক অভিযোগ ছিল।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পুলিশ বাহিনীতে আদর্শগত ভারসাম্যহীনতা, কাঙ্ক্ষিত তথ্যের নিরাপত্তা এবং মাঠপর্যায়ে সরকারের দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কিছু ঘাটতি ও তথ্য ফাঁসের বিষয় পরিলক্ষিত হয়। মূলত এসব প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি পূরণ ও বাহিনীকে আরও নিরপেক্ষ ও পেশাদার করতেই সরকারের এই বড় উদ্যোগ।

শুধু এসআই ও কনস্টেবল পদেই নয়, কর্মকর্তাদের স্তরেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বিশেষ বিসিএস (সম্ভাব্য ৫২তম বিসিএস) বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমে ৪০০ থেকে ৫০০ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ক্যাডার নিয়োগ দেওয়া হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে নবনিযুক্ত ক্যাডারদের প্রথাগত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মেয়াদ কিছুটা কমিয়ে দ্রুত মাঠপর্যায়ে পদায়নের বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, নতুন এই বৃহৎ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা অবলম্বন করা হবে। চূড়ান্তভাবে পদে অন্তর্ভুক্ত করার পূর্বে প্রত্যেক প্রার্থীর রাজনৈতিক, চারিত্রিক ও সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড কঠোর গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই (Verification) করা হবে।

সদর দপ্তরের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সচিব কমিটির সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আনুষ্ঠানিক প্রহর গুনছে বাংলাদেশ পুলিশ।