কালবৈশাখীর ঝড়ে উপড়ে গেল মধুকবির স্মৃতিবিজড়িত আড়াইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী বটবৃক্ষ

0
কালবৈশাখীর ঝড়ে উপড়ে গেল মধুকবির স্মৃতিবিজড়িত আড়াইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী বটবৃক্ষ

কেশবপুর প্রতিনিধি: কেশবপুর (যশোর) কালবৈশাখীর প্রচন্ড ঝড়ে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত প্রায় আড়াইশ’ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বটবৃক্ষটি উপড়ে পড়েছে|

শনিবার দুপুরে আকস্মিক ঝড়ো হাওয়ার তান্ডবে কপোতাক্ষ নদের তীরঘেঁষা জেলেপাড়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক এ বৃক্ষটির পতনে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও বিষাদের ছায়া| স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি গাছ ছিল না ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, সাগরদাঁড়ির ঐতিহ্য এবং মহাকবির শৈশবস্মৃতির এক জীবন্ত সাক্ষী| স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার দুপুরের দিকে হঠাৎ করে আকাশ কালো হয়ে প্রবল বেগে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়| ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে বিকট শব্দে উপড়ে পড়ে বিশালাকৃতির বটবৃক্ষটি| খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন| অনেকেই গাছটির পতন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন| সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা শ্যামল মন্ডল বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এই গাছটিকে দেখে আসছি| আমাদের পূর্বপুরুষরাও এটিকে মহাকবির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখতেন|

আজ গাছটি পড়ে যাওয়ায় মনে হচ্ছে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো| স্থানীয় বাসিন্দা পূজা রানী দাস বলেন, ‘এই বটগাছের নিচে প্রতিবছর পূজা-অর্চনা হতো| গ্রামের মানুষের কাছে এটি ছিল পবিত্র স্থান| গাছটি পড়ে যাওয়ায় আমরা খুবই মর্মাহত| জানা যায়, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পৈতৃক ভিটা থেকে প্রায় ৫০০ মিটার পূর্বদিকে কপোতাক্ষ নদের তীরে প্রায় ২০ শতক জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ছিল বটবৃক্ষটি| ধারণা করা হয়, বৃক্ষটির বয়স আড়াইশ’ বছরেরও বেশি| কবির শৈশবের নানা স্মৃতির সঙ্গে এই গাছটি জড়িয়ে ছিল| সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, মধুসূদন দত্ত তাঁর বিখ্যাত ‘বটবৃক্ষ’ কবিতাটি এ গাছকে কেন্দ্র করেই রচনা করেছিলেন| দীর্ঘদিন ধরে সাগরদাঁড়িতে আগত দর্শনার্থী ও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই বটবৃক্ষ|

কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিদর্শনের পাশাপাশি অনেকে গাছটির ছায়াতলে বসে সময় কাটাতেন| এটি ছিল সাগরদাঁড়ির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ| স্থানীয় শিক্ষক আব্দুল কাদের বলেন, ‘এটি শুধু একটি গাছ নয়, আমাদের সাহিত্য- সংস্কৃতির উত্তরাধিকার| যথাযথ সংরক্ষণ উদ্যোগ থাকলে হয়তো এমন পরিণতি এড়ানো যেত| এখন প্রয়োজন এই স্থানটিকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা| এ ঘটনায় এলাকাবাসী বটবৃক্ষটির অবশিষ্টাংশ সংরক্ষণ এবং সেখানে মহাকবির স্মৃতিফলক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন| তাদের মতে, উপড়ে পড়লেও এই বৃক্ষের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি| বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর ইতিহাস তুলে ধরতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন|

মধুকবির স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাচীন বটবৃক্ষের পতন যেন প্রকৃতির নির্মমতায় হারিয়ে যাওয়া এক জীবন্ত ইতিহাসের প্রতীক| সাগরদাঁড়ির আকাশে আজ তাই শুধু ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন নয়, ভেসে বেড়াচ্ছে এক গভীর সাংস্কৃতিক শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস|