৫৬ লাখ টাকার ক্যানেল কৃষকের গলার কাঁটা: ফুলবাড়ীতে দেড় হাজার বিঘা বোরো ধান পানির নিচে

0
৫৬ লাখ টাকার ক্যানেল কৃষকের গলার কাঁটা: ফুলবাড়ীতে দেড় হাজার বিঘা বোরো ধান পানির নিচে

অমর গুপ্ত: দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে টানা কয়েক দিনের ঝড়োবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে দুই ইউনিয়নের ১০ গ্রামের প্রায় দেড় হাজার বিঘা বোরো ধান খেত। স্বপ্নের ফসল ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে মরণপণ লড়াই করছেন কৃষকরা। কোথাও বুক সমান, কোথাও কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কাটতে হচ্ছে তাদের। ফলন ভালো হলেও এই দুর্যোগে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন এলাকার দুই শতাধিক কৃষক।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ৫নং খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, মহেশপুর, লালপুর, মহদিপুর, পূর্ব নারায়ণপুর এবং ৬নং দৌলতপুর ইউনিয়নের গড়পিংলাই, বারাইপাড়া, আড়াপাড়া, ঘোনাপাড়া, গণিপুর ও পলিপাড়াসহ ১০ গ্রামের ফসলি জমি এখন পানির নিচে। ধান কাটার জায়গা না থাকায় কৃষকরা ভেলায় করে ধান ডাঙ্গায় নিয়ে আসছেন। বিঘা প্রতি ১০ হাজার টাকা চুক্তিতে শ্রমিক নিয়ে তারা ফসল উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকায় ধান পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ভুক্তভোগী কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ২০২০ সালে জাইকা প্রকল্পের অর্থায়নে বারাইপাড়া এলাকায় ২০৬ মিটার দীর্ঘ একটি ক্যানেল (ড্রেন) নির্মাণ করা হয়। দুই পর্যায়ে এই প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় ৫৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলীর অজ্ঞতা ও ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ক্যানেলটি জমি থেকে অন্তত দেড়-দুই ফুট উঁচুতে নির্মিত হয়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশন হওয়ার বদলে জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে। কৃষকদের মতে, এটি এখন উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করছে।

কৃষক মতিবুল রহমান ও মিজানুর রহমানসহ অনেকে জানান, আগে এই জমিগুলোতে চাষাবাদ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের অপরিকল্পিত পুকুর খননের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি এই জমিগুলো এখন বিক্রি করাও সম্ভব হচ্ছে না। এবার ঝুঁকি নিয়ে আবাদ করা মোস্তাফিজার রহমানের ৩২ বিঘা, বাবুর ১৮ বিঘা ও জয়নাল আবেদিনের ৬ বিঘা ধানসহ শত শত বিঘার ফসল এখন পানির নিচে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, “অপরিকল্পিত পুকুর খননই জলাবদ্ধতার মূল কারণ। আমরা এলাকা পরিদর্শন করেছি। পানির গভীরতা বেশি হওয়ায় কম্বাইন হার্ভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ইউএনও সাহেবের সাথে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চলছে।”

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আহমেদ হাছান ক্যানেল নির্মাণে কারিগরি ত্রুটির কথা স্বীকার করে বলেন, “আমরা সেখানে কিছু টেকনিক্যাল ফল্ট পেয়েছি। এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সরেজমিনে এনে দ্রুত বড় পরিসরে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”